তাঁর পায়ে ছিল ঈশ্বরের দেওয়া অসাধারণ প্রতিভা। তাঁর শরীরে ছিল গোল করার পাগলাটে ক্ষমতা, তাঁর চোখে ছিল বড় হওয়ার তীব্র স্বপ্ন, আর তাঁর সামনে ছিল ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তাঁর নাম— মারিও বালোতেল্লি। এক সময়কার সুপার মারিও।
কিন্তু একটা গগনবিদারি আক্ষেপপ আজও ফুটবলকে তাড়া করে— যে বালোতেল্লি একসময় লিওনেল মেসির কাছাকাছি ছিলেন, তিনি কীভাবে নিজের ক্যারিয়ারকে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে মেসি আর তাঁর মধ্যে দূরত্বটা হয়ে গেল আলোকবর্ষসমান!
একজন প্রতিভাবান ফুটবলারের পতনের গল্প নয় শুধু, এটা এমন একজন মানুষের গল্প— যিনি বারবার সুযোগ পেয়েছেন,
বারবার নিজেকে প্রমাণ করার মঞ্চ পেয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি নিজেই।
শৈশবটা বালোতেল্লির জন্য সহজ ছিল না। ইতালিতে বেড়ে ওঠার সময় তাঁকে বারবার শুনতে হয়েছে বর্ণবিদ্বেষের কথা।
একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিশু হিসেবে ইতালিয়ান ফুটবলের মাঠে তাঁকে শুধু প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের সঙ্গেই লড়তে হয়নি—
লড়তে হয়েছে গ্যালারির একটা এলিট শ্রেণির ঘৃণার সঙ্গেও।

খুব ছোট বয়সে বারবার বৈষম্যের শিকার হওয়া একজন মানুষের ভেতরে যে ক্ষত তৈরি হয়, সেটা সবসময় বাইরে থেকে দেখা যায় না। বালোতেল্লির ক্ষেত্রেও হয়তো সেই ক্ষতই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিল রাগে, জেদে, বিদ্রোহে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কারণ বালোতেল্লির আরেকটা সমস্যা ছিল— তিনি নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। সেই আত্মবিশ্বাস গিয়ে ঠেকেছিল দাম্ভিকতায়। গোল্ডেন বয় পুরস্কার জেতার পর তিনি বলেছিলেন, তিনি জানেন না জ্যাক উইলশেয়ার কে!
তারপর তরুণদের মধ্যে যারা এই পুরস্কার জিতেছে, তাদের মধ্যে একমাত্র লিওনেল মেসিকেই নিজের চেয়ে সামান্য ভালো মনে করেছিলেন। ভাবুন একবার! একজন ফুটবলার, যিনি তখনও নিজের ক্যারিয়ারের শুরুতেই— অথচ নিজের প্রতিভা নিয়ে তাঁর বিশ্বাস ছিল প্রায় সীমাহীন।
সমস্যা হলো, এই বিশ্বাসই একসময় তাঁকে পরিশ্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাঁর মনে হতে থাকে— তিনি চাইলে গোল করবেন।
তিনি চাইলে ম্যাচ জেতাবেন। তাঁকে খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই।

আর ফুটবলে প্রতিভা আপনাকে দরজা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই দরজা পেরিয়ে কিংবদন্তি হতে হলে লাগে শৃঙ্খলা। সেটাই যেন বালোতেল্লির ছিল না।
ইন্টার মিলান থেকে ম্যানচেস্টার সিটি — একসময় ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোতে নিজের নাম লিখিয়েছেন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে তাঁর গোল, তাঁর উদযাপন, তাঁর বিতর্ক — সবকিছু মিলিয়ে বালোতেল্লি ছিলেন এক চলমান নাটক।
কিন্তু সমস্যা ছিল, নাটকের মূল চরিত্রটি প্রায়ই ফুটবল থেকে সরে গিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে যেতেন। কোচ রবার্তো মানচিনির সঙ্গে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে তাঁর।
আর কোনো ক্লাবই এমন একজন প্রতিভাবান ফুটবলারকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে চায়নি আর। আজ আবার নতুন কী করে বসেন বালোতেল্লি? এমন ঘূরপাক প্রশ্ন ছিল, আরও ছিলেন তাঁর এজেন্ট মিনো রাইওলা।

রাইওলা ছিলেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী এজেন্ট। কিন্তু বালোতেল্লির মতো তরুণ, বিস্ফোরক মেজাজের একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারে তাঁর ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। আর সবচেয়ে বড় ভুলটা সম্ভবত হয়েছিল অন্য জায়গায়।
বালোতেল্লিকে সবাই বারবার বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ১৭ বছর বয়সে ভুল করলে বলা হয়েছে বয়স কম। দুই বছর পর বলা হয়েছে, বয়সের সাথে মানিয়ে নেবেন। আরও কিছুদিন পর বলা হয়েছে, এটাই তাঁর স্বভাব। ফলে, নিজের ভুলটাকে কোনোদিনও ভুল বলে স্বীকার করতে জানতেন না বালোতেল্লি।
তাঁর প্রতিভা তাঁকে বারবার ক্ষমা এনে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষমা তাঁকে আরও একবার নিজের সীমা অতিক্রম করার সুযোগও দিয়েছে। ইন্টার মিলান, ম্যানচেস্টার সিটি, এসি মিলান, লিভারপুল — ইউরোপের ফুটবলের সবচেয়ে বড় কিছু ক্লাবের জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন বালোতেল্লি।
ইতালির জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন বড় মঞ্চে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, বড় ক্লাবের দরজা তত বন্ধ হয়েছে।একসময় যাঁকে নিয়ে ভবিষ্যতের ব্যালন ডি’অর আলোচনাও হতে পারত, তাঁকে নেমে যেতে হয়েছিল ইতালির দ্বিতীয় স্তরের ফুটবল— সিরি ‘বি’তে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল তখনও তাঁর বয়স মাত্র ৩০! এখন তিনি ৩৫ বছর বয়সে খেলেন সৌদি প্রো-লিগে।

হয়তো আরও অনেক বড় মঞ্চে, আরও অনেক বড় ট্রফির গল্পের নায়ক হতে পারতেন। তবে, নিজের স্বভাবের কাছে হার মেনেছেন বারবার। তিনি ‘সুপার’ বালোতেল্লি হতে পেরেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘ভালো’তেল্লি হতে পারেননি।










