ভাবুন তো, পুরো দেশ একজন মানুষকে ধিক্কার দিয়ে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলেছে। অপমান আর কলঙ্কের ছাইয়ে ছেয়ে গেছে মানুষটার চারপাশ। সেই মানুষটিই একদিন পুরো বিশ্বকে নিজের পায়ের জাদুতে স্তব্ধ করে দিলেন। হয়ে উঠলেন দেশের বিশ্বজয়ের ফিনিক্স পাখি। তিনি আর কেউ নন, ইতালির তারকা পাওলো রসি।
সত্তরের দশকের শেষ দিকে এই ক্ষুরধার গোল শিকারি ইতালির ফুটবল আকাশে উদিত হন। ১৯৫৬ সালে প্রাতোতে জন্মানো এই স্ট্রাইকারের লিকলিকে গড়ন আর গোল করার অদ্ভূত সহজাত ক্ষমতা, তাকে জাতির পরম আশার প্রতীক করে তোলে। ঘরোয়া লিগে পারফরম্যান্সের সুবাদে ১৯৭৮ বিশ্বকাপে ইতালির দলে ডাক পান তিনি। সেবার ইতালির জার্সিতে তিন গোল ও চার অ্যাসিস্ট করেন রসি। দেশ হয় চতুর্থ।
কিন্তু ১৯৮০ সালে ইতালিতে এক ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারি তার সাজানো জীবনে কালবৈশাখী হয়ে আসে! ‘তোতোনেরো’ বলে পরিচিত এই কেলেঙ্কারিতে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন রসি। ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলো নির্দয়ভাবে তার গায়ে সেঁটে দেয় ‘বিশ্বাসঘাতক’ তকমা। দুই বছরের দীর্ঘ নির্বাসনে রসি তখন যেন এক জীবন্ত লাশ।

ঠিক এই অন্ধকার সময়ে রসির ওপর অটল ভরসা রাখেন কোচ এনজো বেয়ারজোট। জহুরি চোখে তিনি চিনে নেন রসির ভেতরে সুপ্ত থাকা বিধ্বংসী স্ট্রাইকারের গুণাবলিকে। ফিটনেস নেই এবং অফ ফর্ম—মিডিয়ার এ ধরনের তীব্র বিষোদগার উপেক্ষা করে ৮২-র বিশ্বকাপ খেলতে যান রসি।
তবে তার শুরুর পারফরম্যান্স মোটেও আশানুরূপ ছিল না। কিন্তু বার্সেলোনার সারিয়া স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল ম্যাচে রসির পুনর্জন্ম হয়। সেদিন অলিম্পাসের দেবতাদের আশীর্বাদে যেন এক রসির কাছেই পরাস্ত হয় সেলেচাওরা।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষেও তার জাদুকরী হ্যাটট্রিকে ইতালি ৪৪ বছর পর পায় বিশ্বজয়ের মুকুট। সে বছর বিশ্বের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একইসঙ্গে গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল আর ব্যালন ডি’অর জিতে রসি গড়েন অনন্য এক রেকর্ড।

রসির গল্প কেবল ফুটবলের ইতিহাস নয়। জীবন, দুঃসময়, রূঢ় বাস্তবতা আর অভাবনীয় সাফল্যের এক মিশ্রিত আখ্যান এটি। যেখানে রসি সবকিছুকে ছাপিয়ে হয়ে উঠেছেন ফুটবলের এক আলোকিত ফিনিক্স পাখি।










