কেনিয়া ক্রিকেট: এক বেদনাবিধুর ট্র্যাজেডি

কেনিয়াকে টেস্ট স্ট্যাটাস দেওয়া উচিৎ কি না - সেই নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। অথচ, ঠিক এরপরই পতনের শুরু।

কেনিয়া, নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে একদল কৃষ্ণ বর্ণের মানুষদের। ২০১৪ সাল আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ কোয়ালিফায়ারের সুপার সিক্স রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের কাছে পরাজিত হয় কেনিয়া৷ ফলাফল স্বরুপ ওয়ানডে স্ট্যাটাস হারাতে হয় তাদের। আইসিসি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ চ্যাম্পিয়নশিপে পঞ্চম পজিশনে শেষ করে তারা।

নেমে আসে আইসিসি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের সেকেন্ড ডিভিশনে। সেকেন্ড ডিভিশনে নিজেদের ছয়টা ম্যাচ হেরে তারা নেমে যায় থার্ড ডিভিশনে। অধিনায়ক রাকিব প্যাটেল সরে আসেন অধিনায়কত্ব থেকে, খেলোয়াড় থেকে কোচ হয়ে যাওয়া থমাস ওদয়ো আর বোর্ড সভাপতি জ্যাকি জান মোহাম্মদ করেন পদত্যাগ৷ আর মৃত্যু হয় কেনিয়ার ক্রিকেটের।

চলুন ঘুরে আসি এক রুপকথার মতো এক মহাকাব্যিক দলের সুখস্মৃতিময় ইতিহাস থেকে। এইতো ২০০৩ সালের কথা, বাংলাদেশ টেস্ট খেলুড়ে দেশ তখন। আর বাংলাদেশের কাছে কেনিয়া ছিল এক অপ্রতিরোধ্য দল। আসিফ করিম, হিতেশ মোদি, মরিস ওদুম্বে, স্টিভ টিকোলা, থমাস ওদোয়ো, মার্টিন সুজি – তাঁরা ছিলেন এক একজন বারুদ। সেই বছর বিশ্বকাপে এক তরফা ভাবে জিতেছিল কেনিয়া।

১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে অভিষেকেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারায় কেনিয়া।

কেনিয়া ওই সময় বাংলাদেশের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে, কেনিয়া একটু এগিয়েই ছিল। ১৯৯৭ সালের ১০ অক্টোবর, বাংলাদেশের বিপক্ষের কেনিয়া করেছিলো ৩৪৭ রান। জবাবে বাংলাদেশ মাত্র ১৯৭ রানে অল-আউট। ফলাফল বাংলাদেশ ১৫০ রানে হার৷ ১৯৯৮ সালে ভারতে হায়দ্রাবাদে কেনিয়াকে হারিয়ে প্রথমবার ওয়ানডে জয়ের পর বাংলাদেশের সেই উল্লাশ এখনো জানান দেয়, সেসময় কেনিয়া কতটা শক্তিশালী ছিল আমাদের কাছে৷

১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে ব্রায়ান লারার উইন্ডিজকে ৯৩ রানে অল-আউট করে পুরা বিশ্বকে সেদিন চমকে দিয়েছিলো কেনিয়া। আর এটিই ছিলো কোনো টেস্ট খেলুড়ে দলে সাথে তাদের প্রথম জয়। ১৯৯৮ সালে ভারতকে ৬৯ রানে হারিয়ে আরেকবার চমক দেখায় তারা।

এরপর ২০০৩ বিশ্বকাপ। কেনিয়ার জন্য স্বপ্নের বছর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সে বছর তারা নিজেদের সেরাটা দিয়েছিলো। পুরো বিশ্বকে সেবার হতবাক করে দিয়েছিলো তারা। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ আর জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনালে যায় তারা। আর সেমিফাইনালেও ভারতের সাথে খুব ভালো খেলে কেনিয়া। কেনিয়াকে টেস্ট স্ট্যাটাস দেওয়া উচিৎ কি না – সেই নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। অথচ, ঠিক এরপরই পতনের শুরু।

কেনিয়ার ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক ছিলেন আসিফ করিম।

২০০৩ বিশ্বকাপের সেই সাফল্য যথেষ্ট হলোনা তাদের ক্রিকেটে টিকে থাকার জন্য। কারণটা হলো ক্রিকেটিয় অবকাঠামো আর জনপ্রিয়তার অভাব। তাদের যতগুলা প্র‍্যাক্টিস নেট আছে, ইংল্যান্ডের একটা পাবলিক স্কুলেও নাকি এর থেকে বেশি প্র‍্যাক্টিস নেট আছে। তার উপর সেই দেশের ক্রিকেট কয়েকটি পরিবারের উপর ছিলো, পুরো কেনিয়ার মানুষের মন জয় করতে পারেনি তারা।

২০০৩ বিশ্বকাপের পর ২০০৭ আর ২০১১ বিশ্বকাপে শোচনীয় অবস্থা, ৮ ম্যাচে জয় মাত্র ১টা। আর এরপরে বিশ্বকাপেই দেখা যায়নি তাদের। মাঠের খেলার সাথে ক্রিকেটের রাজনীতি আর অর্থনৈতিক অবস্থাও করুণ রুপ ধারণ করেছে।

কেনিয়ার বর্তমান অধিনায়ক এখন শেম এনগোচে আর কোচ ডেভিড ওবুইয়া। যিনি সেই ২০০৩ এর বিখ্যাত দলে খেলেছিলেন। মজার বিষয় তার আপন ছোট ভাই কলিন্স ওবুইয়া সাথে দলে আছেন আসিফ করিমের ছেলে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান ইরফান করিমও৷ মানে বুঝা যায় যে, তাদের ক্রিকেট এখনো সেই কয়েকটা পরিবারের মাঝেই বন্দী।

স্বপ্নের মত ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ।

হয়তো কেনিয়ার ক্রিকেট নিজেও তার সুখস্মৃতি রোমান্থনের বেশি কিছু ভাবতে পারেনা৷ ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ খেলা কেনিয়ার অধিনায়ক আসিফ করিম বলেন, ‘কেনিয়ার ক্রিকেট মারা গিয়েছে।’ আচ্ছা, কেনিয়ার ক্রিকেট কি আর কখনো আগের রুপে ফিরবে নাকি এখন শুধু শেষকৃত্যর অপেক্ষা?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...