ফুটবল মাঠ যদি হয় একটা বিশাল খোলা ক্যানভাস, তবে পল পগবা সেখানে কোনো নিয়ম মেনে ছবি আঁকা শিল্পী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক বিমূর্ত চিত্রকর, যার তুলির একেকটা টান ছিল কখনো স্বর্গীয় সুন্দর, আবার কখনো ভীষণ বিশৃঙ্খল। পগবা মানেই ছিল এক অমীমাংসিত সমীকরণ।
প্যারিসের উপকণ্ঠে এক কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী পরিবারে পগবার বেড়ে ওঠা। স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার, আকাশ ছোঁয়ার। কিশোর বয়সেই তার প্রতিভার দ্যুতি পৌঁছে যায় ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের জহুরি চোখ তাকে চিনে নিতে ভুল করেনি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস আর তরুণ পগবার অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে নিয়ে গেল ইতালির তুরিনে। ম্যানচেস্টারের লাল জার্সি ছেড়ে তিনি যখন জুভেন্টাসের সাদা-কালো শিবিরে যোগ দিলেন, ফুটবল বিশ্ব দেখল এক নতুন রাজপুত্রের উত্থান।
জুভেন্টাসে গিয়ে পগবা যেন নিজের ডানার বিস্তার খুঁজে পেলেন। আন্দ্রে পিরলোর শৈল্পিক পাসিং আর আর্তুরো ভিদালের লড়াকু মানসিকতার পাশে পগবা হয়ে উঠলেন ফুটবলের এক কমপ্লিট প্যাকেজ। তার দীর্ঘ পা দুটো যেন অক্টোপাসের শুঁড়, যা থেকে বল কেড়ে নেওয়া অসম্ভব ছিল।

২০১৬ সালে তৎকালীন রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে পগবা যখন আবার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফিরলেন, সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের থিয়েটার অফ ড্রিমসে তিনি এলেন ত্রাতা হিসেবে। কিন্তু এই দ্বিতীয় অধ্যায়টি ছিল বসন্ত আর শীতের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। কখনো তিনি একাই ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়ছেন, আবার কখনো কোচ জোসে মরিনহোর সাথে দ্বন্দ্ব বা চোটের কারণে থাকছেন মাঠের বাইরে। তার প্রতিভা নিয়ে সংশয় ছিল না কারো, কিন্তু ধারাবাহিকতার অভাব তাকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
পগবার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ সময়টি এসেছিল ২০১৮ সালের রাশিয়ায়। ফ্রান্সের নীল জার্সিতে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। এমবাপ্পে-গ্রিজম্যানদের নেপথ্য কারিগর হিসেবে তিনি মাঝমাঠ শাসন করেছেন। ফাইনালের সেই দুর্দান্ত গোলটি ছিল সমালোচকদের মুখে এক সপাটে চড়। বৃষ্টির স্নানে যখন তিনি বিশ্বকাপ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন, তখন মনে হয়েছিল পগবাই বর্তমান ফুটবলের প্রকৃত ফরাসি সম্রাট।
সব মহাকাব্যের শেষটা সুখকর হয় না। পগবার ক্ষেত্রেও নিয়তি যেন কিছুটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠল। চোটের আঘাত, ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন এবং সবশেষ ডোপিং নিষেধাজ্ঞার খড়গ – একসময়ের দাপুটে এই মিডফিল্ডারকে ঠেলে দিল অন্ধকারের দিকে। মাঠের সেই উদ্দাম নাচ, সেই জাদুকরী পাসগুলো আজ যেন কেবলই নস্টালজিয়া।











