রিজওয়ানকে ঘিরে পিসিবির রহস্যময় নাটকীয়তা চলমান!

আদালতের চোখে তিনি অভিযুক্ত নন, কিন্তু তদন্তের মধ্যে আছেন। ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে পারছেন, বিদেশে যেতে পারছেন না। তাহলে তাঁর ভবিষ্যৎ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে?

রিজওয়ান আর পিসিবির মধ্যকার নাটকীয়তা যেন থামছেই না। সর্বশেষ খবর, ১৮ অক্টোবর পিসিবি তাঁকে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার ছাড়পত্র দিয়েছে। প্রেসিডেন্টস ট্রফির শেষ রাউন্ডে কেআরএলের বিপক্ষে এসএনজিপিএলের অধিনায়ক হিসেবে নামবেন তিনি, ১৯ অক্টোবর থেকে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা। শান মাসুদ না থাকায় নেতৃত্ব তাঁরই পাওয়ার কথা ছিল।

অথচ কিছুদিন আগেই উল্টো চিত্র দেখা গিয়েছিল। এসএনজিপিএলে যোগ দিয়ে অনুশীলন করেছেন, দলের মিটিংয়েও বসেছেন, তারপর পিসিবি  জানিয়ে দেয় তদন্ত চলছে বলে তাঁকে লাহোরে ফেরত পাঠাতে হবে, তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটেও খেলতে পারবেন না। ঘরোয়া ক্রিকেটের বাধ্যতামূলক ফিটনেস টেস্ট নিয়েও কথা উঠেছিল। দল তাঁর টেস্ট নিতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু তার আগেই পিসিবি হস্তক্ষেপ করে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরা অন্য খেলোয়াড়দের অবশ্য এমন টেস্ট ছাড়াই দলে যোগ দিতে হয়েছে।

এই সবকিছুর শুরু ইংল্যান্ড সফরে। ৩০ আগস্ট লর্ডস টেস্ট শেষ হওয়ার পর মাঝরাতে পিসিবির দুর্নীতিদমন বিভাগের এক কর্মকর্তা তাঁকে হোটেলের লবিতে নামতে বলেন, সঙ্গে ফোনও নিয়ে যেতে বলেন। সেখানে ছিলেন ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির একজন কর্মকর্তা। বেটিং আর অনলাইন জুয়া নিয়ে প্রশ্ন শুরু হয়, রিজওয়ান কয়েকবার ফোন দিতে রাজি হননি, শেষে দেন এই আশ্বাসে যে তিন ঘণ্টার মধ্যে ফেরত পাবেন। সেই ফোন আর ফেরত আসেনি। এখন সেটা জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থার হাতে, ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে।

এরপর সফরের মাঝপথেই টেস্ট স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েন রিজওয়ান। দেশে ফিরে তাঁকে সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থায় ডাকা হয়, সম্পদ আর ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়। তিনি লাহোর হাইকোর্টে গেছেন, আইসিসিকেও চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে লিখেছেন, “আমাকে কোনো লিখিত নোটিস, লিখিত দাবি, অভিযোগ, চার্জ, ওয়ারেন্ট, রসিদ বা এমন কোনো নথি দেওয়া হয়নি, যেখানে বোঝা যায় কীসের ভিত্তিতে আমার ফোন চাওয়া হচ্ছে।” আদালত তাঁকে স্বস্তি দেয়নি। রায়ে বলা হয়েছে, “এই পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করে যথাযথ সংস্থাকে তদন্ত চালিয়ে যেতে দেওয়াই আদালত সমীচীন মনে করছে।” তবে ডেকে পাঠানো মানে অভিযুক্ত করা নয়, এটাও আদালত স্পষ্ট করেছে।

পিসিবি এতদিন প্রায় কিছুই বলেনি, শুধু জানিয়েছে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। রিজওয়ানকে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতেও দুবার বারণ করা হয়েছে। একটি সূত্রের কথায়, তিনি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন না। যেকোনো ন্যায্য তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, শুধু জানতে চান প্রক্রিয়াটা ঠিক কি না।

ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার ছাড়পত্র পেলেও পুরো জট খোলেনি। রিজওয়ান আসলে পিসিবির কাছে গিয়েছিলেন নেপাল প্রিমিয়ার লিগের এনওসি চাইতে, সেখানে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে তাঁর চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। কিন্তু দেশে ঘরোয়া টুর্নামেন্ট চলার সময় বোর্ড বিদেশি লিগের অনুমতি দিতে নারাজ, তাই সিদ্ধান্ত আসতে পারে প্রেসিডেন্টস ট্রফি শেষ হওয়ার পর।

এর মধ্যে জাতীয় দলে বড় পরিবর্তন এসে গেছে। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচেই পাকিস্তানের হয়ে অভিষেক হয়েছে সাদ বেগের, উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে। তাহলে কি রিজওয়ানের জায়গা আর নেই? এত সহজে বলা যায় না। ২৫৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা, ওয়ানডেতে পাকিস্তানের সবচেয়ে অভিজ্ঞদের একজন। ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে আইসিসি ট্রফির খরা কাটানোর চাপে থাকা দল এমন অভিজ্ঞকে সহজে ছাড়তে চাইবে না। আবার তদন্তের প্রশ্ন ঝুলে থাকলে তাঁকে ফেরানোও সহজ নয়।

আদালতের চোখে তিনি অভিযুক্ত নন, কিন্তু তদন্তের মধ্যে আছেন। ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে পারছেন, বিদেশে যেতে পারছেন না। তাহলে তাঁর ভবিষ্যৎ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে? এই মুহূর্তে এর সৎ উত্তর হলো, সবটা নির্ভর করছে তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর। ফোনের ফরেনসিক রিপোর্টে গুরুতর কিছু না মিললে, আর আইসিসির দুর্নীতিদমন ইউনিটেও কোনো অভিযোগ না গেলে রিজওয়ানের ফেরার পথ খোলা থাকবে।

তখন ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে, ওয়ানডেতে নিজের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে তিনি জাতীয় দলের দরজায় আবার কড়া নাড়তে পারেন। নেপালের এনওসি পেলে বিদেশি লিগে খেলে ফর্ম ধরে রাখার সুযোগও পাবেন। উল্টো দিকে তদন্তে অস্বস্তিকর কিছু বেরোলে শুধু নেপাল নয়, জাতীয় দলের পথও কঠিন হয়ে যাবে। এর মধ্যে সাদ বেগ যদি উইকেটের পেছনে জায়গা শক্ত করে ফেলেন, তাহলে ফেরা আরও কঠিন হবে। আর তদন্ত যদি লম্বা সময় ধরে চলে, তাহলে রিজওয়ান এই মাঝামাঝি অবস্থাতেই আটকে থাকবেন, ঘরোয়া মাঠে খেলবেন কিন্তু বড় মঞ্চের বাইরে।

ফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট, তদন্তের ফল আর নেপালের এনওসি নিয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্ত, এই তিনটার ওপরই নির্ভর করছে তাঁর পরের অধ্যায়। তদন্ত কবে শেষ হবে তা জানা নেই, এনওসির সিদ্ধান্ত আসতে পারে প্রেসিডেন্টস ট্রফি শেষ হওয়ার পর।

Share via
Copy link