খুলনার ভৈরব নদের পাড়ে বেড়ে ওঠা এক কিশোরের চোখে ছিল দিগন্ত ছোঁয়া স্বপ্ন। নাম তার মানজারুল ইসলাম রানা। মাঠের ভেতরে তার উপস্থিতি মানেই ছিল এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যখন তার ওয়ানডে অভিষেক হয়, তখনই ক্রিকেট বোদ্ধারা বুঝেছিলেন, বাংলাদেশ এক লম্বা রেসের ঘোড়া খুঁজে পেয়েছে।
মাঠে তার লড়াই ছিল বীরত্বগাথা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে যখন ধুঁকছিল দল, তখন রানার অলরাউন্ড পারফরম্যান্সই ছিল জয়ের মূল চাবিকাঠি। তার বলে যে ফ্লাইট ছিল, আর ব্যাটে যে জেদ ছিল, তা তাকে খুব দ্রুতই দলের অপরিহার্য অংশ করে তোলে।
রানার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ সময় সম্ভবত ২০০৪-০৫ মৌসুম। জিম্বাবুয়ে যখন বাংলাদেশ সফরে এল, রানা তখন বল হাতে যেন যমদূত। সেই সিরিজে তিনি ম্যান অব দ্যা সিরিজ হয়েছিলেন। তার সেই হাসি মাখা মুখ আর লড়াকু মানসিকতা আজও বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের মনে গেঁথে আছে।

তখন অবধি সব ঠিকঠাক, কিন্তু হঠাৎ করেই এক অভিশপ্ত বিকালে যেন থমকে গেল মহাকাল। ১৬ মার্চ ২০০৭, বসন্তের বাতাস তখনও প্রকৃতিতে বইছে। ডারবানের কিংসমিডে অবশ্য তখন চনমনে রোদ। পরদিন বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচ। কিন্তু সুদূর বাংলাদেশে তখন এক স্তব্ধতা নেমে এল। খুলনার ডুমুরিয়ায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ২৩ বছরের এক তরুণ।
বাতাসে তখন কোনো চিৎকার ছিল না, ছিল কেবল এক স্তব্ধ হাহাকার। যে হাতে বল ঘোরানোর কথা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেটে, সেই হাত দুটি তখন নিথর। যে চোখে ছিল বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন, সেই চোখ দুটি চিরতরে বুজে গেল এক অকাল গোধূলিতে। রানার মৃত্যুর সংবাদ যখন ডারবানের ড্রেসিংরুমে পৌঁছাল, তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়ল মাশরাফি-হাবিবুল বাশারদের মাথায়। রানা ছিলেন সবার প্রিয় ‘খোকন’।
১৭ মার্চ, ২০০৭। ভারত বনাম বাংলাদেশ। পুরো দল চোখের জল মুছে মাঠে নেমেছিল কেবল একজনের জন্য, মানজারুল ইসলাম রানা। মাশরাফি বিন মর্তুজার সেই বিধ্বংসী স্পেল আর তামিম-মুশফিক-সাকিবদের ব্যাটিং বীরত্বে ভারত পরাজিত হলো। ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়া মাশরাফি বলেছিলেন, “এই জয় রানার জন্য।”

মানজারুল ইসলাম রানা কেবল ২৮টি ওয়ানডে আর ছয়টি টেস্ট খেলেছিলেন। পরিসংখ্যান দিয়ে হয়তো তাকে মাপা যাবে না, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্রান্তিলগ্নে তিনি যে সাহস জুগিয়েছিলেন, তা অমূল্য। তিনি শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, জীবন ছোট হলেও তার ব্যাপ্তি বিশাল হতে পারে।
রানা আজ নেই। ভৈরব নদের জল আজও বয়, স্টেডিয়ামে আজও বাতি জ্বলে, কিন্তু সেই প্রাণোচ্ছল ছেলেটি আর ফিরে আসে না। তবুও যখন গ্যালারিতে লাল-সবুজের শোরগোল ওঠে, মনে হয় কোথাও হয়তো সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রানা। তিনি হারাননি, তিনি মিশে আছেন বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক জয়ের উল্লাসে।










