ঝলসানো রুটি থেকে পূর্ণিমার চাঁদ

জীবন যেখানে প্রতি পদে ক্ষুধার পাণ্ডুলিপি লেখে, সেখানে স্বপ্ন দেখা এক দু:সাহসী বিলাসিতা। কিন্তু কিশোর সাকিবের কাছে ক্রিকেট কোনো বিলাসিতা ছিল না, তা ছিল এক তপ্ত মরুভূমিতে মরূদ্যানের খোঁজ।

‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ – কবি সুকান্তের এই হাহাকার বিহারের গোপালগঞ্জের সেই কিশোরটির জীবনে নিছক কোনো কবিতা ছিল না, ছিল এক রূঢ় বাস্তবতা। জীবন যেখানে প্রতি পদে ক্ষুধার পাণ্ডুলিপি লেখে, সেখানে স্বপ্ন দেখা এক দু:সাহসী বিলাসিতা। কিন্তু কিশোর সাকিবের কাছে ক্রিকেট কোনো বিলাসিতা ছিল না, তা ছিল এক তপ্ত মরুভূমিতে মরূদ্যানের খোঁজ।

হায়দ্রাবাদের জার্সি গায়ে সাকিব হুসাইন যখন বল হাতে দৌড় শুরু করলেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি কেবল বাইশ গজের দূরত্ব অতিক্রম করছেন না, বরং পেরিয়ে আসছেন বছরের পর বছর জমে থাকা অভাবের হিমালয়। আইপিএলের অভিষেক মঞ্চেই ২৪ রান দিয়ে চার উইকেট নেওয়া সেই বিধ্বংসী স্পেলটি আসলে সাকিবের একার নয়। এটি এক জননীর নীরব আত্মত্যাগ আর এক পঙ্গু পিতার চরম অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে জয় ঘোষণা।

নিউজিল্যান্ডের সাবেক পেসার মিচেল ম্যাকক্লেনাগান সাকিবের বোলিংয়ের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন বাংলাদেশের ‘কাটার মাস্টার’ মুস্তাফিজুর রহমানের এক ডানহাতি সংস্করণ। যশস্বী জয়সওয়ালের মতো তারকা ব্যাটার যখন সাকিবের মরণঘাতী স্লোয়ারে বিভ্রান্ত হয়ে সাজঘরে ফিরছিলেন, তখন ধারাভাষ্যকারদের কণ্ঠেও বিস্ময়। কিন্তু এই বিস্ময়কর দক্ষতার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে এক করুণ অথচ বীরত্বগাথা ইতিহাস।

সাকিবের শৈশব ছিল এক তপ্ত দুপুরের মতো তপ্ত ও নির্দয়। যে বয়সে ছেলেরা খেলনা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, সাকিব তখন লড়ছিলেন অস্তিত্বের সাথে। তিনি জানতেন, একজোড়া স্পাইকের মূল্য ১০-১৫ হাজার টাকা – যা দিয়ে তাদের পুরো পরিবারের কয়েক মাসের অন্নসংস্থান সম্ভব। সাকিব আজও শিউরে উঠে বলেন, ‘জুতো কিনলে আমাদের হাড়িতে ভাত চড়বে কোত্থেকে?’

ঠিক সেই কালবেলায় সাকিবের মা সুবুকতারা খাতুন নিলেন এক অকল্পনীয় সিদ্ধান্ত। নিজের যক্ষের ধন সম্বল করা সামান্য গয়নাগুলো তিনি সঁপে দিলেন সাকিবের স্বপ্নের চরণে। মায়ের সেই শূন্য কবজি আর গলার অলঙ্কারের বিনিময়েই কেনা হয়েছিল সাকিবের প্রথম স্পাইক। সেই জুতোর প্রতিটি ফিতে ছিল আসলে এক মায়ের হাজারো প্রার্থনার বন্ধন।

বিহারের সেই জরাজীর্ণ ঘরের দাওয়ায় বসে আজ যখন তার অসুস্থ পিতা আইপিএলের মতো মঞ্চে সাকিবের গতির ঝড় দেখেন, তখন হয়তো গর্বে ভরে ওঠে তাঁর পিতৃহৃদয়। স্বপ্ন যদি খাঁটি হয় আর তার পেছনে যদি থাকে জননীর তপ্ত দীর্ঘশ্বাস, তবে ভাগ্যবিধাতাও বাধ্য হন তার পাণ্ডুলিপি নতুন করে লিখতে।

সাকিব হুসাইন আজ কেবল একজন বোলার নন। তিনি এক জীবন্ত প্রমাণ যে, দারিদ্র্যে পূর্ণিমার চাঁদ রুটির মতো ঝলসানো হলেও, সেই রুটিই এক সময় জগতজয়ের শক্তি জোগায়। গতির এই মহাকাব্য সবে শুরু হলো, যার প্রতিটি শব্দ লেখা হয়েছে ঘাম, রক্ত আর এক জননীর নি:শব্দ ত্যাগের কালিতে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

ত্রিদেশীয় সিরিজে তুরুপের তাস কারা?

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে হাসান মাহমুদের প্রত্যাবর্তন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত পারফরম্যান্সে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে চলেছেন হাসান! লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর বোলিংয়ের ধার এবার সাদা বলেও দেখতে চাইবে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা। গতি, নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ আর ব্যাটারকে ভুল করতে বাধ্য করার দক্ষতা তাঁকে করে তুলতে পারে পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়া থেকে শুরু করে মাঝের ওভারে রান আটকে রাখা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা হতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ। টেস্টের আত্মবিশ্বাস ওয়ানডেতেও অনূদিত হলে হাসানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বোলিংয়ে যোগ করতে পারে বাড়তি ধার। তবে একাদশে সরাসরি জায়গা পাবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়ের জায়গা।

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

Share via
Copy link