২০২৪ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর দিয়ে সহকারী কোচ হিসেবে মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের যাত্রা শুরু হয়। এ বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শেষে তাঁকে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত নতুন করে চুক্তিবদ্ধ করে বিসিবি। কিন্তু মাত্র ছয় মাস পরই দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা—ক্রিকেট অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে বিস্ময়। স্থানীয় কোচদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে এসেছিলেন তিনি, কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জে হেরে গেলেন।
ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জাতীয় দলের ব্যাটিং ব্যর্থতা এবং তা নিয়ে বোর্ডের ভেতর-বাইরের সমালোচনার চাপ নিতে পারছিলেন না সালাউদ্দিন। আবার কেউ কেউ বলছেন, ড্রেসিং রুমে ক্ষমতার ভারসাম্য, পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং পরিবেশগত অস্বস্তিই তাঁকে এই সিদ্ধান্তে ঠেলে দিয়েছে।
জানা গেছে, গণমাধ্য ও সামাজিক মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে বোর্ড সভাপতি খোঁজ নিচ্ছিলেন। বিষয়টি জানার পর সালাউদ্দিন ক্ষুব্ধ হন। তাঁর মনে হয়েছে, জাতীয় দলে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নেই।
সালাউদ্দিন মূলত জাতীয় দলের ব্যাটিং বিভাগ দেখতেন। তাঁর অধীনে গত এক বছরে ব্যাটিং পারফরম্যান্সের কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, এশিয়া কাপ ও আফগানিস্তান সিরিজে দল ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাকের আলীকে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক করার সিদ্ধান্ত, এবং ড্রেসিং রুমে সিদ্ধান্তগ্রহণে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগেও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। অনেকের মতে, এই চাপই তাঁকে ক্লান্ত করে তুলেছে।
এদিকে, বিসিবি ইতোমধ্যে আয়ারল্যান্ড সিরিজে মোহাম্মদ আশরাফুলকে ব্যাটিং কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে—যা সালাউদ্দিনের অভিমানে আরও ঘিঁ ঢেলে দিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও, এমন গুঞ্জন তিনি নিজে অস্বীকার করেছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ‘আমি যদি কাজটা ঠিকভাবে করতে পারি, পরের কোচদের জন্য বড় একটা পথ খুলে যাবে। আমি যদি ভালো করতে পারি, দেশি কোচদের অনেক জায়গাতেই পথ সহজ হবে।’
কিন্তু দায়িত্বের ঠিক এক বছর পর—২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর যোগদান, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর পদত্যাগ—সেই স্বপ্ন অসমাপ্তই রয়ে গেল। বিসিবির ইতিহাসে দেশি কোচদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ পারিশ্রমিক, সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি, এবং ‘সিনিয়র সহকারী কোচ’ নামে বিশেষ পদবি—সবই পেয়েছিলেন সালাউদ্দিন। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানদের ব্যক্তিগত ও টেকনিক্যাল উন্নতি না হওয়াটাই সালাউদ্দিনের কোচিংয়ের বড় ব্যর্থতা। তানজিদ হাসান, হৃদয়, শান্ত বা লিটন—কেউই ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিক হতে পারেননি।
একজন সিনিয়র কোচের দায়িত্ব শুধু টেকনিক নয়, মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা। সেই জায়গায়ও সালাউদ্দিন পিছিয়ে পড়েছেন বলে মনে করছেন অনেক সাবেক ক্রিকেটার।
বিপিএলে বারবার সফল হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় দলে সেই ছাপ ফেলতে না পারা, এবং শেষ পর্যন্ত অভিমান নিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে দেশের কোচদের প্রতি বোর্ডের আস্থা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সালাউদ্দিনের পদত্যাগ শুধু একজন কোচের চলে যাওয়া নয়; এটি দেশীয় কোচদের জন্যও এক আত্মসমালোচনার মুহূর্ত। তিনি যে পথ তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সেটি এখন আরও কঠিন হয়ে গেল। হয়তো সময়ই বলে দেবে—এই পদত্যাগ কি ব্যর্থতার প্রতীক, নাকি নতুন সূচনার ইঙ্গিত!











