বাংলাদেশ ক্রিকেটের নেপথ্য কারিগর মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন কখনো হাততালির প্রত্যাশা করেননি, কিন্তু এমন এক বিষাক্ত বাউন্সারও তাঁর দিকে ধেয়ে আসবে, তা হয়তো ভাবেননি। আজীবন ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার বাঁচানোর চেষ্টা করা এই মানুষটির দিকে ‘স্বজনপ্রীতি’র অভিযোগ দিয়েছে এক বুক কষ্ট।
জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ হিসেবে তাঁর সময়কালটা ছিল অদ্ভুত এক বৈপরীত্যে মোড়ানো। এই সময়ে টেস্টের মেজাজে বাংলাদেশ ছিল অনন্য, দশ টেস্টের মধ্যে ছয়বারই জয় এসে ধরা দিয়েছে বাংলাদেশের কাছে। এমনকি টি-টোয়েন্টিতেও ৩৫ ম্যাচে ১৯টি জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে টাইগাররা, যা লাল-সবুজের ক্রিকেটে এক দারুণ ইতিবাচক অধ্যায়।
তবে আসল ধাক্কাটা লেগেছে একদিনের ক্রিকেটে, যেখানে ২৪ ম্যাচে ১৫টি পরাজয়ের বিপরীতে জয়ের দেখা পাওয়া গেছে মাত্র আটবার। আর এই ব্যর্থতার আড়ালেই ডালপালা মেলেছে এক গুরুতর অভিযোগ। গুঞ্জন ওঠে, সালাহউদ্দিন কেবল দুই অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত আর লিটন দাসকে সমর্থন দিয়েছেন এবং তরুণ অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজকে করেছেন চরম উপেক্ষা।

সব অভিযোগের মুখে দাঁড়িয়ে সালাহউদ্দিন তীব্র ক্ষোভের সাথে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডেইলি সান-এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। একজন মানুষ হিসেবে আমি সবার কাছে গিয়ে প্রমাণ করতে পারব না যে আমি ভালো। তবে আমাদের কোচিং প্যানেলে কোনো এমন কিছুই ছিল না। আমরা দলের উন্নতির কথাই চিন্তা করে গেছি।’
বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরোনো গুমোট সংস্কৃতির বিপরীতে এক নতুন এবং খোলামেলা পরিবেশের গল্প শুনিয়েছেন সালাহউদ্দিন। তাঁর মতে, কোনো খেলোয়াড় প্রশ্ন তুললে তাকে বাদ দেওয়ার মতো প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা তাঁদের ছিল না। তবুও শেষ সিরিজে পাওয়া এই অপবাদের ক্ষতকে তিনি বেদনাদায়ক বলেই মেনে নিয়েছেন।
সিনিয়র খেলোয়াড়দের সাথে সম্পর্কের অবনতির কারণেই কি তাঁর এই বিদায়? এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘সাকিব আল হাসান বা তামিম ইকবাল আমাকে পছন্দ করে না, এমন ধারণাটাই ভুল। আমাদের মাঝে অভিমান থাকতে পারে, কিন্তু কোনো বিদ্বেষ নেই।’ কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়, তিনি বিদায় নিচ্ছেন এক নতুন মিশনের উদ্দেশ্যে।

জাতীয় দল থেকে সালাহউদ্দিনের এই প্রস্থানকে বোর্ড কোনো শাস্তি বা পদাবনতি হিসেবে দেখছে না। পাইপলাইন শক্তিশালী করতে ক্রিকেট বোর্ড তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ‘হাই-পারফরম্যান্স’ (এইচপি) ইউনিটের। এই নতুন দায়িত্বকে নিজের চেনা শিকড়ে ফিরে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত গড়ার এক দারুণ সুযোগ হিসেবেই দেখছেন এই মাস্টারমাইন্ড।
ক্রিকেটার তৈরির এই কারিগর এখন আর পেছনের কাঁদা ছোড়াছুড়ি নিয়ে একদম ভাবছেন না। সালাহউদ্দিনের চোখ আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনায়। সময়ের হাতেই তিনি ছেড়ে দিয়েছেন সমস্ত বিতর্কের শেষ উত্তর। সালাহউদ্দিন বিশ্বাস করেন, তাঁর হাত ধরেই আবার গড়ে উঠবে আগামী দিনের কোনো শান্ত, লিটন কিংবা বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন কোনো ধ্রুবতারা।










