রাজমিস্ত্রী থেকে হেক্সার লক্ষ্যে!

মাকে সাহায্য করতে কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি, কখনো বাজারের ফলের দোকানে বিক্রয়কর্মী, আবার কখনো রাস্তায় মানুষের গাড়ি ধুয়ে দিয়েছেন তিনি।

দারিদ্র্যের নির্মম শৃঙ্খল ভেঙে, ধুলোবালি আর ঘামের গন্ধ মাখা এক অতীতকে পেছনে ফেলে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ঝলমলে মঞ্চে পা রাখছেন ব্রাজিলের ইগর থিয়াগো। রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে সেলেসাওদের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়ার এই অবিশ্বাস্য গল্প যেন কেবল ফুটবল নয়, জীবনের এক পরম জয়ের মহাকাব্য।

লাতিন আমেরিকার ফুটবল ইতিহাসে দরিদ্রতার সাথে লড়াই করে পৃথিবীজোড়া নাম করার ঘটনা অতীতেও ঘটে গেছে বহুবার। পেলে কিংবা ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো লাতিন আমেরিকার ফুটবল ঈশ্বররা যেভাবে চরম অভাবের বুক চিরে রাজত্ব জয় করেছিলেন, থিয়াগো যেন সেই চেনা ইতিহাসেরই এক আধুনিক রূপ। ব্রাজিলের বস্তি আর গলির ফুটবল থেকে উঠে আসা এই ফরোয়ার্ড প্রমাণ করেছেন, অদম্য ইচ্ছেশক্তির কাছে নিয়তিকেও হার মানতে হয়।

মাত্র তেরো বছর বয়সে মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে যাওয়ার পর কিশোর থিয়াগোর কাঁধে চেপেছিল সংসারের ভারী জোয়াল। মাকে সাহায্য করতে কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি, কখনো বাজারের ফলের দোকানে বিক্রয়কর্মী, আবার কখনো রাস্তায় মানুষের গাড়ি ধুয়ে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু, বুক থেকে কখনোই মুছে যেতে দেননি ফুটবলের স্বপ্ন।

সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখনই একটু অবসর মিলত, থিয়াগো মেতে উঠতেন তাঁর চিরকালের প্রেম ফুটবলের সাথে। সেই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত পায়ের ছোঁয়ায় বল যেন কথা বলতে শুরু করতো। এক এনজিওর টুর্নামেন্টে তাঁর এই লুকিয়ে থাকা জাদুকরী প্রতিভা চোখে পড়ে স্কাউটদের, যা বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ।

ছোট ক্লাব ভেরে-তে অনূর্ধ্ব-১৭ আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে থিয়াগো নজর কাড়েন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ক্রুজিরোর। তবে পারানা নদীর শান্ত প্রকৃতি ছেড়ে বেলো হরিজন্তের ব্যস্ত শহুরে জীবনে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং গোল করার তীব্র মানসিক চাপ সামলানো ছিল থিয়েগোর ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা।

সব সমালোচনাকে পায়ের ড্রিবলিংয়ে উড়িয়ে দিয়ে থিয়াগো ২০২২ সালে পাড়ি জমান ইউরোপে। বুলগেরিয়ার লুডুগেরেটস আর বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুজ হয়ে ২০২৪ সালে ৪১ মিলিয়ন ডলারে বিইশাল মূল্যের বিনিময়ে যোগ দেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে। সেখানে চলতি মৌসুমে ২২ গোল করে তিনি এখন আর্লিং হালান্ডের ঠিক পেছনেই সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়।

গত মার্চে ব্রাজিলের সোনালী-হলুদ জার্সিতে অভিষেক ঘটিয়ে ইতিমধ্যেই জালের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছেন এই তরুণ গোলমেশিন। কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বকাপ দলের এক অন্যতম প্রধান অস্ত্র এখন তিনি। উত্তর আমেরিকার সবুজ মাঠজুড়ে বিশ্বমঞ্চ মাতানোর অপেক্ষায় থাকা ইগর থিয়াগো আজ বিশ্বের কোটি ভাগ্যবঞ্চিত মানুষের কাছে এক জীবন্ত ও জ্বলন্ত অনুপ্রেরণার নাম।

লেখক পরিচিতি

বেঁচে আছি না পড়া বইগুলো পড়ব বলে

Share via
Copy link