আবুধাবিতেও কি ফিরবে সেই পুরোনো মোসাদ্দেক!

ডাবলিনে তিনি এসেছিলেন সাকিবের বিকল্প হয়ে, এবার আসছেন নিজের নামে। একসময় যাঁর ব্যাটে ঝড় ছিল, চার বছরের অপেক্ষা তাঁকে শিখিয়েছে নিজেকে প্রমাণ করে কীভাবে ফিরে আসতে হয়। ডাবলিনের সেই বিকেলে ঝড়ে উড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মিরপুরের ফেরার দিনে অস্ট্রেলিয়া। এবার আবুধাবির মরুভূমিতে কি আরও একবার সেই ঝড় দেখা যাবে? সেই উত্তর দিবেন মোসাদ্দেক খেলার মাঠেই।! 

ডাবলিনের  সেই বিকেলে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে  তখন ৫ উইকেটে ১৪৩ রান, জিততে আরও ৬৭ দরকার, হাতে ৫০ বলও নেই। ছয়বার ফাইনালে গিয়ে খালি হাতে ফেরা দলের সমর্থকদের মনে তখন একটাই ভয়, আবারও কি ঠিক এই জায়গায় এসে সব শেষ হয়ে যাবে? ক্রিজে এলেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। সাকিব আল হাসানের জায়গায় একাদশে এসেছিলেন তিনি, আর ওই বিকেলেই বাংলাদেশের প্রথম ত্রিদেশীয় শিরোপার সবচেয়ে উজ্জ্বল পাতাটা লেখা হলো তাঁর ব্যাটে।

গল্পটার শুরু অবশ্য আরও আগে। ময়মনসিংহের এই ছেলে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছেন দুবার, যুব দলের অধিনায়কত্বও করেছেন। সতেরো বছর বয়সে খেলেছেন দ্বিতীয় লিস্ট এ ম্যাচ, আর সেটাতেই করে ফেলেছেন সেঞ্চুরি। ২০১৪-১৫ মৌসুমে বরিশাল বিভাগের হয়ে একটা ম্যাচে করলেন ২৫০, ৪৪৮ বলের ধৈর্যের ইনিংস। তার কয়েক দিন পরের ম্যাচেই ৩০৯ বলে ২৮২।

পরের মৌসুমে আরও একটা ডাবল সেঞ্চুরি, আর প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে প্রথম শ্রেণিতে তিনটি দ্বিশতকের মালিক। স্পিনের বিপক্ষে পায়ের কাজ, পেসের বিপক্ষে স্বচ্ছন্দ ব্যাটিং, সঙ্গে অফস্পিন। এই মিশ্রণ দেখে মানুষের মনে একটা নামই আসছিল, সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশে ব্যাট আর বল দুটোতেই কাজে লাগে এমন কাউকে দেখলে সাকিবের সঙ্গে তুলনাটা হয়ে যায়, আর সেই তুলনার বোঝা কম বয়সেই চাপল মোসাদ্দেকের কাঁধে।

আন্তর্জাতিক অভিষেকটা ছিল সিনেম্যাটিক। ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে প্রথম বলেই উইকেট নিলেন, বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে। সেদিন সাত নম্বরে নেমে অপরাজিত ৪৫ করলেন, বল হাতে ১০ ওভারে ২ উইকেটও নিলেন। ২০১৭ সালের মার্চে বাংলাদেশের শততম টেস্টে কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে আট নম্বরে নেমে খেললেন ৭৫ রানের ইনিংস। ২০১৯ বিশ্বকাপের দলে যখন নাম এল, আইসিসি তাঁকে গণ্য করল টুর্নামেন্টের পাঁচ চমকের একজন হিসেবে।

আর ডাবলিনের সেই ফাইনাল। মোসাদ্দেক ক্রিজে এলেন যখন সৌম্য, মুশফিক, মিঠুন সবাই ফিরে গেছেন। প্রথমে একটু সময় নিলেন, তারপর ২২তম ওভারে জয়ের জন্য ১৮ বলে দরকার ২৭ রান, তখন ফ্যাবিয়ান অ্যালেনকে তিন ছক্কা আর এক চারে নিলেন ২২ রান। পরের ওভারেই মাহমুদউল্লাহ কভার ড্রাইভে জয়সূচক রান নিলেন, ৭ বল হাতে রেখে। দুজনের অবিচ্ছিন্ন ৭০ রানের জুটিতে বাংলাদেশ জিতল, মোসাদ্দেকের ফিফটি হলো বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম, সেই রেকর্ড এখনও অক্ষত। ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে তিনি তখন তেইশ বছরের তরুণ।

তারপর কেমন যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেলেন তিনি। ২০২২ সালের আগস্টে জিম্বাবুয়েতে প্রথমবার আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেতৃত্ব দিলেন, সেটা ছিল টি-টোয়েন্টি। সেই বছরই খেলেছেন শেষ ওয়ানডে, নভেম্বরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে গেছেন বছরের পর বছর, কিন্তু ডাক আসেনি। গুঞ্জন ছিলো, মেহেদী হাসান মিরাজের মতো একই ধরনের অলরাউন্ডার হওয়ায় তাঁর জন্য জায়গা বের করা কঠিন। চার বছর এর বেশি সময় জাতীয় দলের ওয়ানডে একাদশের বাইরে কাটিয়ে দিলেন তিনি।

ফিরলেন ২০২৬ সালের ৯ জুন, মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে। ওই মৌসুমের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর হয়ে সাত ইনিংসে ৩৩৬ রান করে এসেছিলেন তিনি, গড় ৬৭.৩৩। ২৬তম ওভারে শান্তর আউটের পর ১৪০ রানে ৪ উইকেট নিয়ে যখন মিডোল অর্ডার ধসের মুখে, তখন নামলেন মোসাদ্দেক। তিনবার জীবন পেলেন, আর প্রতিবারই সেটার পুরো দাম আদায় করে নিলেন। ৭০ বলে ৭টি চার আর ৩টি ছক্কায় অপরাজিত ৮৬, ওয়ানডেতে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস, দল পৌঁছাল ২৮৪ রানে। বল হাতে ১০ ওভারে ৩৭ রানে ২ উইকেট, সঙ্গে একটা দারুণ  ক্যাচ। চার বছর পর ফিরে ম্যাচসেরা, আর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে হারাল ২১ বছর পর। সিরিজেও সবচেয়ে বেশি রান ছিল মোসাদ্দেকের, ১৫৭। বাংলাদেশ সিরিজ জিতল, সিরিজসেরা হলেন তিনিই।

সাত বছরের মাথায় আবার সেই ত্রিদেশীয় সিরিজ, আবার সেই মোসাদ্দেক। লিটন দাসের নেতৃত্বে ১৬ জনের দলে আছেন তিনি, ১৭ অক্টোবর শনিবার আবুধাবির জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শুরু, ২১ অক্টোবর আফগানিস্তান, ফাইনাল ২৩ অক্টোবর। সামনে ২০২৭ বিশ্বকাপ, আর এই সিরিজ তাঁর জন্য সেই দলে জায়গা পাকা করার সুযোগ। ডাবলিনে তিনি এসেছিলেন সাকিবের বিকল্প হয়ে, এবার আসছেন নিজের নামে। একসময় যাঁর ব্যাটে ঝড় ছিল, চার বছরের অপেক্ষা তাঁকে শিখিয়েছে নিজেকে প্রমাণ করে কীভাবে ফিরে আসতে হয়। ডাবলিনের সেই বিকেলে ঝড়ে উড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মিরপুরের ফেরার দিনে অস্ট্রেলিয়া। এবার আবুধাবির মরুভূমিতে কি আরও একবার সেই ঝড় দেখা যাবে? সেই উত্তর দিবেন মোসাদ্দেক খেলার মাঠেই।!

আফগান ঘূর্ণির মায়াজালে ধরাশায়ী হবে মিরাজ-রাজারা?

তবে স্পিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। দুই বছরের ওয়ানডে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্পিনাররা শিকার করেছেন মোট ৮২টি উইকেট। যদিও চলতি বছরে ১২ ম্যাচে স্পিন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ২৬ উইকেট, ২০২৫ সালে ১১ ম্যাচে রিশাদ, মিরাজ, তানভীর, নাসুমদের শিকার ছিল ৫৬ উইকেট। গত বছর বাংলাদেশের অধিকাংশ ম্যাচেই স্পিন সহায়ক উইকেট থাকলেও চলতি বছরে দলটি খেলেছে তুলনামূলক স্পোর্টিং উইকেটে। ফলে কন্ডিশনের সহায়তা পেলে বাংলাদেশের স্পিনাররাও যে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে সক্ষম, তার ইঙ্গিত মিলছে পরিসংখ্যানেই। রিশাদ হোসেনের আক্রমণাত্মক লেগ স্পিন, মেহেদী হাসান মিরাজের নিয়ন্ত্রিত অফ স্পিন, তানভীর ইসলামের বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনের সঙ্গে নতুন সংযোজন রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম। বৈচিত্র্য আর কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে মরণকামড় দিতে মরিয়া থাকবে বাংলাদেশও।

Share via
Copy link