ক্যারিবীয়দের উড়িয়ে ভাঙল ফাইনালের অভিশাপ!

দীর্ঘ সময়ে এশিয়া কাপ থেকে বিশ্বকাপ, সব আসরেই গেছে বাংলাদেশ। কখনো গ্রুপ পর্বে থেমেছে, কখনো কোয়ার্টার ফাইনালে, কখনো সেমিফাইনালে, আর কালেভদ্রে পৌঁছেছে ফাইনালে। কিন্তু ফাইনালে গিয়ে বারবার খেই হারিয়েছে দলটা।

১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফির শিরোপা হাতে নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বকে জানিয়েছিল, আমরাও আছি। তারপর কেটে গেছে দুই দশকের বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে এশিয়া কাপ থেকে বিশ্বকাপ, সব আসরেই গেছে বাংলাদেশ। কখনো গ্রুপ পর্বে থেমেছে, কখনো কোয়ার্টার ফাইনালে, কখনো সেমিফাইনালে, আর কালেভদ্রে পৌঁছেছে ফাইনালে। কিন্তু ফাইনালে গিয়ে বারবার খেই হারিয়েছে দলটা।

২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা আর জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে হার, ২০১২ সালের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের কাছে, চার বছর পর একই টুর্নামেন্টে ভারতের কাছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষত রেখে গেছে ২০১৮ সাল, যেখানে জিম্বাবুয়ের ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কার কাছে হার, নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে ভারতের কাছে আর দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে শেষ বলে ভারতের কাছে হার। ছয়বার ফাইনালে গিয়ে খালি হাতে ফেরা দলকে দিয়ে নির্ধারিত হয়েই গেছিল এই দল কে দিয়ে কিছুই হবেনা।

সেই তকমা ঝেড়ে ফেলার সুযোগটা এল ২০১৯ সালের মে মাসে, বিশ্বকাপের ঠিক আগে আয়ারল্যান্ডে। ওয়ালটন ওডিআই ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল স্বাগতিক আয়ারল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পুরো সিরিজেই বাংলাদেশ খেলল এমন এক ক্রিকেট, যেখানে ব্যাটসম্যানদের চোখে ছিল আগ্রাসন আর বোলারদের হাতে ছিল ধার। যে দলটাকে নিয়ে বলা হতো হিটিং পাওয়ার নেই, সেই দলই রান তাড়ায় আর বড় স্কোর গড়ায় নিজেদের ভিন্ন চেহারায় দেখাল। ফাইনালে ওঠার পর সামনে দাঁড়াল সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যাদের ব্যাটিং লাইনআপ যেকোনো দিন যেকোনো বোলিং আক্রমণকে এলোমেলো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ডাবলিনের মালাহাইডে টস জিতে মাশরাফি বিন মুর্তজা আগে ফিল্ডিং বেছে নিলেন। সাকিব আল হাসান পেশির চোটের কারণে ছিলেন না। লিটন দাস, আবু জায়েদ আর রুবেল হোসেনও বাদ পড়লেন, তাঁদের জায়গায় এলেন সৌম্য সরকার, মোসাদ্দেক হোসেন, মেহেদী হাসান মিরাজ আর মুস্তাফিজুর রহমান। শুরুটা অবশ্য ভালো হলো না। শাই হোপ আর অ্যামব্রিস মিলে উইন্ডিজকে এনে দিলেন দুর্দান্ত সূচনা, ২০.১ ওভারে বিনা উইকেটে ১৩১ রান। তারপর নামল বৃষ্টি। কয়েক ঘণ্টা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির পর ম্যাচ নেমে এল ২৪ ওভারে, উইন্ডিজ শেষ করল ১ উইকেটে ১৫২ রানে, হোপ ৭৪ আর অ্যামব্রিস ৬৯ রানে অপরাজিত। মিরাজ ২২ রানে পেলেন একমাত্র উইকেট। বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়াল ২৪ ওভারে ২১০ রান, মানে ওভারপ্রতি প্রায় ৯ রান।

এমন লক্ষ্যে দরকার ঝড়ো শুরু, আর সেটা এনে দিলেন তামিম ইকবাল আর সৌম্য সরকার। ৫.৩ ওভারে উঠল ৫৯ রান। শ্যানন গ্যাব্রিয়েল তামিমকে ১৮ রানে ফেরালে সাব্বির রহমানকে তিন নম্বরে পাঠানো হলো, কিন্তু দ্বিতীয় বলেই রানের খাতা না খুলে ফিরলেন তিনি। চাপ বাড়তে পারত, কিন্তু সৌম্য সেটা হতে দিলেন না। ৯টি চার আর ৩টি ছক্কায় ৪১ বলে ৬৬ রানের ইনিংসে তিনি ম্যাচটা বাংলাদেশের দিকে এনে দিলেন। অন্য প্রান্তে মুশফিকুর রহিম খেললেন ২২ বলে ৩৬ রানের এক ছোট্ট ঝড়ো ইনিংস।

ঠিক যখন মনে হচ্ছিল জয় এখন সময়ের ব্যাপার, তখনই রেমন রেইফার পরপর দুই ওভারে সৌম্য আর মুশফিককে তুলে নিলেন। মোহাম্মদ মিঠুনও ১৭ রানে ফিরে গেলে ১৫.৪ ওভারে ৫ উইকেটে ১৪৩ রানে আটকে গেল বাংলাদেশ। গ্যালারিতে আর টিভির সামনে বসা মানুষের মনে নিশ্চয়ই ফিরে এসেছিল পুরোনো ফাইনালগুলোর স্মৃতি। আগের ছয়বারও তো ঠিক এভাবেই জয়ের কাছে গিয়ে ফসকে গিয়েছিল।

এবার সাকিবের জায়গায় দলে আসা মোসাদ্দেক হোসেন ধীরে শুরু করলেন, তারপর একসময় সবকিছু  উড়িয়ে ঝড় শুরু করলেন । ২৭ বলে ২টি চার আর ৫টি ছক্কায় অপরাজিত ৫২ রান, ২০ বলের ফিফটি টা বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম হাফসেঞ্চুরি। মাহমুদউল্লাহ ১৯ রানে অপরাজিত থেকে জয়সূচক বাউন্ডারিটা মারলেন, আর ৭ বল বাকি থাকতেই ২২.৫ ওভারে ৫ উইকেটে ২১৩ রান তুলে ফেলল বাংলাদেশ। উইন্ডিজের হয়ে গ্যাব্রিয়েল আর রেইফার নিলেন দুটি করে উইকেট। ম্যাচসেরা হলেন মোসাদ্দেক।

সপ্তম ফাইনালে এসে ভাঙল সেই দীর্ঘ অপেক্ষা। ২৩ বছর পর বাংলাদেশের ঘরে এল একাধিক দলের কোনো টুর্নামেন্টের প্রথম শিরোপা। এরপর অনেক কিছু বদলেছে, মাশরাফি নেই, সেই প্রজন্মের অনেকেই বিদায় নিয়েছেন বা শেষ বেলার দিকে। কিন্তু ডাবলিনের সেই বিকেলটা থেকে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মৃতিতে, প্রমাণ হিসেবে যে এই দল শেষ মুহূর্তে চাপ সামলে জিততে জানে।

সেই গল্পের পরের অধ্যায়ের জন্য এবার বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে অনেক বছর পর আরব আমিরাতের মাঠে। আফগানিস্তান আর জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ শুরু হচ্ছে ১৭ অক্টোবর, শনিবার। প্রথম ম্যাচেই জিম্বাবুয়ে, ২১ অক্টোবর আফগানিস্তান, আর সেরা দুই দলের ফাইনাল ২৩ অক্টোবর। ডাবলিনের মতো আরেকটা ত্রিদেশীয় সিরিজ, আরেকটা ফাইনালের হাতছানি। আয়ারল্যান্ডে যে দলটা সপ্তমবারে এসে ফাইনাল জিতেছিল, আমিরাতের মরুভূমিতে নতুন প্রজন্মের সামনে সেই গল্পটা আবার লেখার সুযোগ আছে।

আফগান ঘূর্ণির মায়াজালে ধরাশায়ী হবে মিরাজ-রাজারা?

তবে স্পিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। দুই বছরের ওয়ানডে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্পিনাররা শিকার করেছেন মোট ৮২টি উইকেট। যদিও চলতি বছরে ১২ ম্যাচে স্পিন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ২৬ উইকেট, ২০২৫ সালে ১১ ম্যাচে রিশাদ, মিরাজ, তানভীর, নাসুমদের শিকার ছিল ৫৬ উইকেট। গত বছর বাংলাদেশের অধিকাংশ ম্যাচেই স্পিন সহায়ক উইকেট থাকলেও চলতি বছরে দলটি খেলেছে তুলনামূলক স্পোর্টিং উইকেটে। ফলে কন্ডিশনের সহায়তা পেলে বাংলাদেশের স্পিনাররাও যে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে সক্ষম, তার ইঙ্গিত মিলছে পরিসংখ্যানেই। রিশাদ হোসেনের আক্রমণাত্মক লেগ স্পিন, মেহেদী হাসান মিরাজের নিয়ন্ত্রিত অফ স্পিন, তানভীর ইসলামের বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনের সঙ্গে নতুন সংযোজন রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম। বৈচিত্র্য আর কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে মরণকামড় দিতে মরিয়া থাকবে বাংলাদেশও।

Share via
Copy link