তিনি আইপিএলে কখনও খেলেননি। ভারতীয় হলেও, তাই তাঁর নামটা খুব পরিচিত নয়। টিভির পর্দায় তাঁর বল করা কেউ দেখেনি। কিংবা জাতীয় দলের জার্সিতে হাত উঁচিয়ে উদযাপন করা তো দূরের কথা। কিন্তু, জন বুকানন,অস্ট্রেলিয়ার দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী কোচ তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ইচ্ছাশক্তি দিয়ে যদি একজন খেলোয়াড়কে বিবেচনা করা হয়, তাহলে হোকাইতো চ্যাম্পিয়ন।
হোকাইতো হুজেতো ঝিমোমি। নাগাল্যান্ডের ক্রিকেটার। ভারতের এমন এক রাজ্য, যেখানে ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবল বেশি জনপ্রিয়। সেই নাগাল্যান্ডে মাঠ পাননি খেলার। খোলা জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে বল ঘুরিয়ে ক্রিকেট শেখা শুরু তাঁর। কোনো একাডেমি, কোনো কোচ ছিল না। শুধুই ছিল স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরার একরোখা জেদ।
তখন ২০০৮ সাল। আইপিএল তখন কেবল শুরু হয়েছে। কেকেআরের নেটে বল করার সুযোগ পেলেন হোকাইতো। সেই সুযোগটাই আসলে তাঁর জীবনের গল্প। বাবা-মাকে কোনোক্রমে বুঝিয়ে গুয়াহাটি থেকে এক সকালে গিয়ে হাজির হলেন কলকাতার নেটে। জেদ ধরলেন, তাঁকে বোলিং করতে দিতেই হবে। আজকের দুনিয়ায় নিরাপত্তা ভেদ করে ওতো দূর যাওয়াই যাবে না, তখনও কঠিন ছিল।

সেই কঠিন কাজটা করে ঢুকেছিলেন, জন বুকাননের মন গলিয়েছেন। স্রেফ নেটে একটু বোলিং করার সুযোগের জন্য। বয়সভিত্তিক খেলেছেন বলে আগে থেকেই চিনতেন ঋদ্ধিমান সাহা আর মনোজ তিওয়ারিকে। হোকাইতো জেদের কাছে হার মানতে হয় বুকাননকে।
বড় কোনো নাম নয় তিনি, এমনকি দলের কেউও চিনতেন না তাঁকে। কিন্তু সেদিন অনুশীলনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল করলেন, বিশ্রাম ছাড়াই। এমন শ্রম, এমন নিবেদন চোখে লেগেছিল কোচ বুকাননের। সেদিন থেকেই শুরু সেই নীরব সম্পর্ক — এক চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে আরেকজনের। বুকানন লিখেছেন, ‘আমি কখনও ভাবিনি ওই জেদি ছেলেটা আমাদের সেট-আপের চিরস্থায়ী অংশ হয়ে যাবে।’
বুকানন তাঁর বই ‘দ্য ফিউচার অব ক্রিকেট’–এ পুরো একটি অধ্যায় লিখেছেন হোকাইতোকে নিয়ে -‘দ্য বয় ফ্রম নাগাল্যান্ড’। বুকানন লিখেছেন, ‘ও যখন বলল, আমি নাগাল্যান্ডের একমাত্র ক্রিকেটার — আমি বিশ্বাস করেছিলাম। ওর চোখে আমি দেখতে পেয়েছি নিজের রাজ্যের পতাকা উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন।’

শাহরুখ খানের আয়োজনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও ডাক পেতেন হোক। সেই আয়োজনগুলোতে শাহরুখ খানের প্রশংসাও কুড়াতেন। দলের বাসে যেতেন, মাঝেমধ্যে হোটেল থেকেও টিম বাসে করে মাঠে আসতেন। দলের সবার সাথে দারুণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু, আইপিএলের মূল স্কোয়াডে জায়গা হয়নি। বুকানন জানতেন, সুযোগ হয়তো আসবে না। কিন্তু তবু তিনি চেয়েছিলেন হোক যেন থাকে — দলে না হোক, ক্রিকেটের কাঠামোতে যেন থাকে হোকাইতো।
২০০৮ আর ২০০৯ – দুই মৌসুম কলকাতায় কাটানোর পর ২০১২ সালে আসামের হয়ে রঞ্জিতে অভিষেক হয়। তারপর নিজের রাজ্য নাগাল্যান্ডের হয়েও খেলা শুরু। ২০২২ সালে যখন দুলীপ ট্রফিতে প্রথমবার অংশ নেয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল, তখন তাদের অধিনায়ক—হোকাইতো ঝিমোমি।
তিনি হলেন এক পথিকৃৎ, একজন অনুপ্রেরণা। ৩৮ বছর বয়সী হোকাইতো ঝিমোমি ৩৭ টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে খেলেছেন। একটি সেঞ্চুরিও আছে। কলকাতার নেটে বাঁ-হাতি মিডিয়াম পেস করা ছেলেটা ততদিনে ব্যাটার বনে গেছেন। ১৭৭ রানের সেই ইনিংস দিয়ে নয়, ক্রিকেট হোকাইতোকে মনে রাখবে তাঁর হার না মানা জেদের জন্য। ’

সব সাফল্য স্কোরকার্ডে ধরা পড়ে না। কিছু জয় হয়—জেদে, লড়াইয়ে, আর একটা রাজ্যকে ক্রিকেটের মানচিত্রে তুলে ধরার সাহসে। হোকাইতোর কথা লেখা হয় না পত্রিকার হেডলাইনে, কিন্তু তাঁর গল্প লেখা থাকে কারও মনে। অন্তত জন বুকানন তাঁকে কোনোদিন ভুলতে পারেননি। এমন ‘চ্যাম্পিয়ন’ কি প্রতিদিন জন্মায়?










