২০০৭, জোহানেসবার্গ। পাকিস্তান শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়ে একজন — মিসবাহ উল হক। যোগিন্দর শর্মা গুড লেন্থে বল করলেন, চাপা গর্জন। মিসবাহ খেললেন এক প্যাডেল সুইপ, বল উঠল আকাশে — আর গড়িয়ে পড়লেন মাটিতে, শর্ট ফাইন লেগে শ্রীশান্তের হাতে নিভে গেল স্বপ্নের আলো।
সে এক মুহূর্ত—যেখানে পাকিস্তানের হৃদপিণ্ড ভেঙে রক্ত ঝরল আর মিসবাহ, হয়ে পাকিস্তানের জাতীয় ঘৃণার পাত্র। তাঁর ঠান্ডা মাথার সাহস সেখানে হয়ে উঠেছিল বোকামির অপর নাম। সেই শট, সেই ক্যাচ, সেই ফাইনাল — পাকিস্তানিদের চোখে আজও চিরকালীন অভিশাপ।
তারপর তিনি হারিয়ে গেলেন, তিন বছর, চার বছর। বাইশ গজের বাইরে, ভ্রু কুঁচকে তাকানো বিশ্লেষকদের জিহ্বায় জ্বালা ধরিয়ে,
ঘরোয়া লিগে, আড়ালে, নিরবে পুড়লেন।

তবু আগুন তো নিভে না সহজে। ৩৩ বছর বয়সে, ফিরে এলেন। ভগ্নপ্রায় পাকিস্তানকে হাতে তুলে নিলেন। মাঝে মাঝে স্লো, মাঝে মাঝে ঝড় — কিন্তু সবসময় একজন, যাকে ভরসা বলা চলে।
২০০৯ সালে দলকে উপহার দিলেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শিরোপা যখন উঠল সবুজ হাতে, তখনও কেউ ভাবেনি—এই লোকটাই একদিন পাকিস্তানকে টেস্টে শীর্ষে নিয়ে যাবে।
২০১০, লজ্জার এক ইংল্যান্ড সফর শেষে, স্পট ফিক্সিংয়ে ডুবে যাচ্ছিল পাকিস্তানের সম্মান। এই সময়ে আলো হয়ে দাঁড়ালেন তিনি — অধিনায়ক মিসবাহ উল হক। তিনি খেললেন শান্ত রণে, চিৎকার না করে উত্তর দিলেন রান দিয়ে, ধৈর্য দিয়ে, ব্যাট আর কাঁধে ভর করে পাকিস্তানকে দাঁড় করালেন বিশ্বাসের কাঠামোয়।

২০১৬ সালে পাকিস্তান যখন টেস্ট র্যাংকিংয়ে এক নম্বর, লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শশ্রুমণ্ডিত এক প্রায় বৃদ্ধকে দেখা যায়। তিনি তখন ৪২, হাঁকিয়ে দিলেন শতক, আর স্যালুটে জানালেন — আহত বাঘ হয়ে মিসবাহ উ লহক ফিরে এসেছেন। দশটি পুশ-আপ—ক্রিকেটে এমন উদযাপন আগে কোথাও ছিল না।
এমনকি শেষ ম্যাচেও তিনি রেকর্ড রেখেই গেলেন— উইন্ডিজের মাঠে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয় পাকিস্তানের, শেষ ম্যাচ, শেষ হাসি—সবই তার নামে লেখা।
মিসবাহ না হলে কেউ হয়তো জানত না, শতক না পেয়েও ওয়ানডেতে পাঁচ হাজার রানে পৌঁছানো যায়। হয়তো কেউ বুঝত না — বীরত্ব মানেই শুধু বোলিং অ্যাটাক ভাঙা নয়, কখনো কখনো বীরত্ব মানে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর দলে থেকে দলকে ধরে রাখা।

তিনি কখনও খব ক্যারিশমাটিক ছিলেন না, নন-গ্ল্যামারাস, সাদামাটা মুখ। তবে মাটিতে পা রাখা যে ক্রিকেটাররা আকাশ ছুঁতে পারে, তার প্রমাণ মিসবাহ উল হক। একসময় ছিলেন ‘ভুলের মূর্ত প্রতীক’, শেষমেশ হয়ে গেলেন ‘নেতৃত্বের নামান্তর’।










