ভাগ্যিস ইংল্যান্ডের আবহাওয়া বিরক্তিকর রকমের মলিন, না হলে হয়তো ক্রিকেটের মানচিত্রে ব্রাজিলের উত্থান কখনোই ঘটত না। বিশ্বে ফুটবলের রাজ্যে ক্রিকেটের এমন আশ্চর্য উত্থান এখন শুধু ব্রাজিলকেই নয়, বরং সমগ্র আমেরিকাকেই নতুন করে ভাবাচ্ছে।
ব্রাজিলের ছিল নিজস্ব এক ব্যাট-বল খেলা—রাস্তায় সেই জনপ্রিয় খেলার নাম তাকো। কিন্তু, আন্তর্জাতিক ফরম্যাটের ক্রিকেট ছিল কার্যত অদৃশ্য। মোড় ঘুরল ২০০০ সালে, যখন ইংল্যান্ডের পেশাদার ক্রিকেটার ম্যাট ফেদারস্টোন তার ব্রাজিলিয়ান স্ত্রীকে নিয়ে পোঁস দে কালদাসে এসে বসবাস শুরু করলেন।
স্ত্রী বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন ইংল্যান্ডের সেই চিরচেনা শীত, বৃষ্টি আর ধূসর আকাশে। ছয় মাসের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু ব্রাজিলের রোদেলা উষ্ণতায় সেই দিনগুলো স্থায়ী হয়ে গেল।

আজ ফেদারস্টোন ব্রাজিল ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। তাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে নতুন ইতিহাস—যার প্রতীক ব্রাজিল নারী দল। তারা এখন আইসিসি টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে ৩৫তম, লাতিন আমেরিকার মধ্যে সেরা।
শুরুটা ছিল বিন্দুমাত্র আড়ম্বর ছাড়া। খুচরো ব্যবসায় স্ত্রীর সহায়তা, মাঝেমধ্যে স্কোয়াশ শেখানো—এসবের ফাঁকে ফেদারস্টোন ভাগ করে নিয়েছিলেন নিজের প্রিয় খেলাটিকে। শতভাগ স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টায় ক্রিকেট ঢুকে পড়ে স্থানীয় সম্প্রদায়ের জীবনে। আর ২০০৬ সালে আইসিসির সদস্যপদ পাওয়া বদলে দেয় সবকিছু—খোলে ফান্ডের দুয়ার।
এখন ক্রিকেট ব্রাজিলের বাৎসরিক বাজেট প্রায় এক মিলিয়ন ডলার। নিবন্ধিত খেলোয়াড় লাখের ঘরে। আগামী বছরে মাঠে নামবেন ৬০ জন ডেভেলপমেন্ট অফিসার। বিশেষ করে নারী ক্রিকেটারদের গল্প অনন্য—পুরো দলটাই স্থানীয় মেয়ে, এবং ২০২০ সাল থেকে তারা পেশাদার চুক্তির অধীনে।

ফেদারস্টোন বললেন, ‘শুরুতে আমরা ক্রিকেট নিয়ে গিয়েছিলাম ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে, বেসরকারি স্কুলে। ভুল করেছিলাম। পরে গিয়েছি দরিদ্র মহল্লায়, দিয়েছি সরঞ্জাম, দিয়েছি সুযোগ। সেখানেই মানুষ খেলাটিকে গ্রহণ করেছে।’
শুধু ব্রাজিল নয়, গোটা আমেরিকাতেই এখন ক্রিকেটের নতুন দিগন্ত। দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে ক্রিকেট খুঁজছে ভারত নির্ভরতার বাইরে নিজের নতুন ভবিষ্যৎ। আইসিসির নজর এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রে, আর ব্রাজিলের উত্থান সেই পরিকল্পনাকে শক্তি জোগাচ্ছে।
২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন পুরো বাজার দর্শন পাল্টে দিতে পারে। ব্রাজিল অলিম্পিক কমিটির পূর্ণ সদস্যপদ ক্রিকেটকে দিয়েছে অভূতপূর্ব বৈধতা ও অর্থায়ন। ফেদারস্টোনের স্বপ্ন বড়। তাঁর চাওয়া, ব্রাজিল একদিন খেলবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে, হয়তো অলিম্পিকেও।

তিনি বললেন, ‘এখানে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। অর্থ আর সুযোগ মিললে ব্রাজিল কেন বিশ্বকাপে খেলবে না? আমি চাই একদিন ক্রিকেট হোক ব্রাজিলের জাতীয় খেলা।’
ভেজা-শুষ্ক লন্ডন ছেড়ে রৌদ্রজ্বল ব্রাজিলে আসা এক ইংরেজ মানুষের হাতে এভাবেই বোনা হচ্ছে ক্রিকেটের লাতিন আমেরিকান রূপকথা। জোগো বনিতোর ফুটবল দুনিয়ায় ঠাই করে নিচ্ছে ক্রিকেটের আস্ফালন।










