ক্যারিয়ার প্ল্যানিং শিখুন মেহেদীর কাছে

বিপিএলের সবচেয়ে বড় আবিস্কার নি:সন্দেহে অধিনায়ক শেখ মেহেদী হাসান। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও বাগিয়ে নেবেন।

হঠাৎ করে পাওয়া কোনো অর্জন নয়। এটা কার্যত শেখ মেহেদীর নিজের নেওয়া ক্যালকুলেটিভ রিস্ক। ক্যারিয়ার প্ল্যান করতে যেভাবে মানুষ কখনও একটু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় আর তাতে সফল হয়, তারই বাস্তব উদাহরণ হলেন শেখ মেহেদী।

সেই ঝুঁকি নেওয়ার সুফলই তিনি পাচ্ছেন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই তাঁর সিদ্ধান্তগুলো আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। রংপুর রাইডার্স ছেড়ে আসা, অকশনে নিজের নাম না তোলা, কম পেমেন্ট জেনেও চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজিতে সাইন করা—সবকিছুর পেছনে একটা মাত্র কারণ, অধিনায়কত্ব। তিনি জানেন, এই একটা এক্স ফ্যাক্টরে তিনি বাকিদের চেয়ে এগিয়ে পারেন।

তিনি বিসিবিকে একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন। বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি শুধু নিয়মিত টি-টোয়েন্টি দলে থাকার দাবিদার নন, তিনি অধিনায়কত্বের জন্যও প্রস্তুত। এই বিপিএলই তার একমাত্র পোর্টফোলিও। এবারের বিপিএলে তাঁর সেই পোর্টফোলিও বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে।

১১ ম্যাচে ১৫ উইকেট নিয়েছেন, ইকোনমি সাতের নিচে। ১৭৩ রান করেছেন, যেখানে তাঁর গড় প্রায় ৩৫, আর স্ট্রাইক রেট ১৪৪-এর ওপরে। বোলিংয়ে তিনি চতুর। নিজের ব্যাটিং সীমাবদ্ধ রেখেছেন শুধুই ফিনিশারের ভূমিকাতে। তিনি জানেন, জাতীয় দলে কোন জায়গায় তাঁর চাহিদা আছে। নিজের সামর্থ্যটাও জানেন।

রংপুর রাইডার্সে থাকলে আরও ‘সেফ’ খেলার অবস্থানে থাকতেন। বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি। পারিশ্রমিক নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেই। কিন্ত, সেখানে থাকলে নিজের নামের পাশে কোনো এক্স-ফ্যক্টর যোগ করা সম্ভব হত না হয়ত, সেই বাস্তবতা মেনেই ঝুঁকি নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি পাল্টে ফেলেছেন।

রংপুর রাইডার্সে তিনি যথেস্ট পারিশ্রমিক পেতেন, হয়তো এখনকার চেয়ে বেশিই পেতেন। কিন্তু, যথেষ্ট স্পেস পেতেন না। অনেক তারকার ভিড়ে আড়ালে থাকতেন। এই আর্থিক স্যাক্রিফাইস করে বিপিএলে অধিনায়কত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্তটা তাই নিছক আবেগী বা দলগত নয়, এটা ঠান্ডা মাথার ক্যারিয়ার প্ল্যানিং।

মাঠে যেটা দেখিয়েছেন, সেটা তাঁর পরিকল্পিত আগ্রাসন। স্থানীয়দের মধ্যে বাড়তি কিছু করার জন্য নেতৃত্ব পাওয়ার দরকার ছিল। চট্টগ্রাম রয়্যালসের মালিকানা নিয়ে সংকট ছিল। কিন্তু, দায়িত্ব বিসিবি নিয়ে ফেলার পর মেহেদীর জন্য নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া আরও সহজ হয়ে যায়।

মেহেদী কেবল টি-টোয়েন্টিই খেলেন। তারপরও তাঁর সাথে অদৃশ্য লড়াই হয় ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির পারফরমার মেহেদী হাসান মিরাজের সাথে। পাবলিক সেন্টিমেন্ট মিরাজের পক্ষে থাকে প্রায়ই। মিরাজ দলে না থাকলে যে পরিমান হাহাকার হয়, ততটা হয় না মেহেদীর জন্য। ঘরোয়া ক্রিকেটে তৈরি হচ্ছেন আলিস আল ইসলামের মত সম্ভাবনারাও।

স্পেশালিস্ট অফ স্পিনার হিসেবে শেখ মেহেদীর তাই নিজের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানোর তাগিদ ছিল। তিনি আগেও জাতীয় দলে সহ-অধিনায়কত্ব করেছেন। তাঁর জায়গায় পরে নুরুল হাসান সোহান কিংবা জাকের আলী অনিককে দিয়েছে বাংলাদেশ। সেই হারানো জায়গাটাই আপাতত খুঁজছেন মেহেদী।

বাংলাদেশ দলের ইতিহাস বলে দেয়, পরবর্তী সময়ে দলে টিকে থাকতে হলেও অধিনায়ক হওয়াটা কতটা জরুরী। অধিনায়ক হওয়ার তাগিদ থেকেই শেখ মেহেদী বনে গেছেন ম্যাচ উইনার, দলকে ফাইনালে তুলেছেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফাইনালে তিনি জিতুন কিংবা নাই জিতুন, টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার তাঁর হাতে না উঠলে সেটা বিপিএলের জন্যই হবে অবমাননাকর।

তবে, নিজের জায়গাতে শতভাগ সফল শেখ মেহেদী। লিটন দাসের পর অধিনায়ক হওয়ার দৌড়ে তার নাম যে বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে। চ্যাম্পিয়নের ট্রফি হাতে নিলেই কেবল সেই সাফল্যের পূর্ণতা আসবে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link