মুখে হাসি, ব্যাটে আগ্রাসন

কখনো ‘দ্য বুল’ বা আগ্রাসী যোদ্ধা, কখনো আবার মুহূর্তের মধ্যে উইকেটের মাঝে চওড়া হাসিতে বিনোদন ছড়িয়ে দেওয়া এক প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ।

মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে গ্লাভস পরতে পরতে চোখে যে দ্যুতি দেখা যেত, তাতেই বোলারদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ডেভিড ওয়ার্নার – নামটাই যেন এক ঝোড়ো হাওয়ার সমার্থক, যিনি বাইশ গজে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে প্রতিপক্ষের সমস্ত হিসাব নিকাশ ওলটপালট করে দিতে পারতেন। কখনো ‘দ্য বুল’ বা আগ্রাসী যোদ্ধা, কখনো আবার মুহূর্তের মধ্যে উইকেটের মাঝে চওড়া হাসিতে বিনোদন ছড়িয়ে দেওয়া এক প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ।

ক্যারিয়ারের শুরুতে ওয়ার্নারের পরিচয়টা ছিল একটু অন্যরকম। আধুনিক ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই সেই বিরল রত্ন, যিনি ফার্স্ট ক্লাস বা লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের কোনো বড় মঞ্চে পা রাখার আগেই সরাসরি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি দিয়ে দেশের জার্সিতে অভিষেক ঘটিয়েছিলেন ২০০৯ সালে। সিডনিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলেছিলেন সেই বিস্ফোরক ইনিংস। মাত্র ৪৩ বলে ৮৯ রান। বিশ্ব ক্রিকেট অবাক হয়ে দেখেছিল এমন এক মারকাটারি ব্যাটারকে, যাঁর শটে ছিল না কোনো রাখঢাক, ছিল শুধুই প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসযজ্ঞ।

তবে শুরুর এই চমকটাই সব পথ সহজ করে দেয়নি। ওয়ার্নারের জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা আসে ২০১৮ সালের কেপটাউন টেস্টে। সেই কুখ্যাত বল টেম্পারিং বা স্যান্ডপেপার গেট কেলেঙ্কারি। ক্রিকেটবিশ্ব সেদিন ফুঁসে উঠেছিল, অস্ট্রেলিয়া হারিয়েছিল তাদের তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ ও সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারকে।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তাঁকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে এবং আজীবন নেতৃত্বের দরজা বন্ধ করে দেয়। নিষিদ্ধ এই সময়ে ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে হলেও ওয়ার্নার নিজের ভেতরের জেদটাকে মরতে দেননি।

আর সেই জেদেরই দুর্দান্ত জবাব মিলেছিল পরের বছর ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে। নির্বাসন কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে ডেভিড ওয়ার্নার ব্যাট হাতে যেন এক প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়েছিলেন। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৪৭ রান করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাঘ একবার খাঁচায় বন্দি হলেও তার শিকারের খিদে ফুরিয়ে যায় না।

​এর দুই বছর পর, ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যখন অস্ট্রেলিয়া প্রথমবারের মতো এই ফরম্যাটের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন দলের সাফল্যের নেপথ্য কারিগর ছিলেন ওই ওয়ার্নারই। আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদকে একাই ট্রফি জেতানো এই ওপেনার মাঠের বাইরে যেমন ছিলেন দলের প্রাণভোমরা, মাঠের ভেতর ঠিক তেমনি ছিলেন বোলারদের বুক চিরে রান তুলে নেওয়া এক আতঙ্ক।

সবুজের চাদরে ঘেরা বাইশ গজ একদিন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্দয় যোদ্ধাকে চিরদিনের মতো বিদায় জানাল। যিনি ব্যাট হাতে নামলে উইকেটে নেমে আসত ঝোড়ো বৈশাখী। পরিসংখ্যান বা শতকের হিসাব ছাপিয়ে ডেভিড ওয়ার্নার মানেই আজ এক রূপকথার শেষ পাতা, যেখানে কালির বদলে লেখা আছে ঘাম, রক্ত আর অদম্য জেদের একেকটি সোনালী অক্ষর। বাইশ গজের মায়া কেটে গেলেও ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ের ক্যানভাসে ওই চওড়া হাসি আর আগ্রাসী তর্জনি উত্তোলনের দৃশ্যটি চিরকাল এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান হয়ে বেঁচে থাকবে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link