তিনি হাসছেন! কি ভিষণ অদ্ভুত এক হাসি! কি মায়াবী সুখ মিশে আছে সেই চাহনীতে। মিশে আছে কত রাতের ক্লান্তি, হারানোর ব্যাথা আর কত প্রজন্মের পতাকা নামিয়ে ফেলার আক্ষেপ।
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের পর আর কিছু বলার থাকে না। কিছু লেখার থাকে না। সব দেনা পাওনা চুকে-বুকে গেছে সেদিন। আর কিছু করার নেই, কোথাও যাবার নেই।
বলা হচ্ছিল, লাতিন ফুটবল নাকি সেকেলে। আজকাল নাকি তার ছন্দে আর বিপ্লব করতে চায় না। ইউরোপীয় মেশিনের সামনে লাতিন আবেগ অচল—এমন কথাই তো ভেসে বেড়াচ্ছিল। এমনকি কিলিয়ান এমবাপ্পের মুখ ফসকেও নাকি সে কথা বেরিয়ে এসেছিল।
কিন্তু ইতিহাস জানে, কিছু বিপ্লব তত্ত্ব দিয়ে আসে না। আসে একজন মানুষের কাছ থেকে। আসে একজন মাসিহা দিয়ে। হাজার বছর পর লাতিন পৃথিবীর বুকে আবার একজন পথপ্রদর্শক জন্মেছিলেন। যার পায়ের ছোঁয়ায় ছন্দ ফিরে পায় অবহেলিত আবেগ। ১৮ ডিসেম্বর, ২০২২—সেই দিনটা তাই আর পাঁচটা তারিখের মতো নয়।

এক অসমাপ্ত উপন্যাসের শেষ অধ্যায়। মাসিহার নাম—লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
অবশ্য তার আগেও মেসি একটা ‘নাম’ ছিলেন। প্রতিদিন তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে, কাগজ শেষ হয়েছে, কিবোর্ড হ্যাং হয়েছে। তবু লেখা থামেনি। কারণ মেসি আসলে একজন মানুষ নন—মেসি একটা উপন্যাস। হাজার অর্জনে ঠাসা সেই উপন্যাসের একটা অধ্যায় ছিল ফাঁকা।
ওই ফাঁকা পাতাটা দেখলেই শুধু মেসির নয়, লক্ষ-কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের বুকের ভেতর হাহাকার উঠত। প্রায় বিশ বছরের ক্যারিয়ার, অজস্র ট্রফি—তবু একটা আক্ষেপ, শুধু একটা—একটা বিশ্বকাপ।
২০২২-এর ফাইনালেও ভয় ছিল। ফরাসি মেশিন বারবার ম্যাচের রং পাল্টাচ্ছিল। মেসি গোল করলেন, আবার করলেন। কিন্তু এমবাপ্পে করলেন ইতিহাস—১৯৬৬-এর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথম হ্যাটট্রিক। তবু শেষ হাসিটা ফ্রান্সের হল না। টাইব্রেকারে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দাঁড়ালেন দেয়াল হয়ে। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ উঠল আর্জেন্টিনার হাতে।

সেদিন আক্ষেপ মাটি চাপা পড়ল। ডিয়েগো ম্যারাডোনার দেশের মাটি আবার একজন জাদুকর পেল। পুরো ফুটবল বিশ্ব নাচল। শুধু একটাই আক্ষেপ—সেই দিনটা দেখার জন্য ম্যারাডোনা নেই। তিনি থাকলে হয়তো আকাশটা আরও একটু নীল হত।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে লড়াই? সে তো এখন ইতিহাসের পাতা। মেসি তখন পৌঁছে গেছেন দূর আকাশের তারা হয়ে—যেখানে ম্যারাডোনা, পেলে আগে থেকেই অপেক্ষায়। মেসি প্রমাণ করলেন—কালজয়ী উপন্যাসের পূর্ণতা আসে শেষ অধ্যায়েই।
১৮ ডিসেম্বরের পর আমার আর তাই মেসিকে নিয়ে কিছু বলার নেই। মেসি হাসছেন। অদ্ভুত এক হাসি। এই হাসির ভেতরে মিশে আছে কত কৈশোর, কত তারুণ্য। কত মেসি-রোনালদোর ঝগড়া, কত বিশ্বসেরার তর্ক-বিতর্ক।
কত আক্ষেপ, কত না বলা যন্ত্রনা। মাশচেরানোর অসহায় চেহারা, মেসির শূন্য দৃষ্টি, হতবাক নীল-সাদা ডাগ আউট। ছাদ থেকে কাঁদতে কাঁদতে পতাকা নামিয়ে ফেলার সেই সব কাতর রাত। পরদিনের স্কুল, অফিস, বিছানার এপাশ-ওপাশ। বুকে ফ্রেমে জমে থাকা ক্ষোভ – সব উড়ে গিয়েছিল এক নিমিষে। এখান থেকে সমস্ত জোছনা অফুরান হয়ে রইল।

লিওনেল মেসি হাসছেন, খুব অচেনা লাগে সেই দৃশ্য। সেই হাসি অর্জনের রাতটা তাঁর মতই গোটা ফুটবল দুনিয়ার জন্য অর্জনের। পৃথিবীব্যাপী একই রাতে সবচেয়ে আনন্দের রাত সবাই মিলে উপভোগ করাও তো সাফল্য। এরপর পৃথিবীর সব মিথ্যা, আর কিছুই বলার থাকে না, লিওনেল মেসি আর কিছুই বলতে দেন না।










