রাজস্থানের ধুলো ওড়া ঝুনঝুনু জেলার এক সাধারণ প্রৌঢ় দলিপ চৌধুরীর জীবনদর্শন এখন এক আশ্চর্য কাব্যে রূপ নিয়েছে। যে মেঘ তিনি দুই দশক ধরে বুকের ভেতর জমিয়েছিলেন ত্যাগের বৃষ্টি হয়ে, আজ সেই বৃষ্টির ধারায় স্নাত হয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের মানচিত্রে এক নতুন নদীর জন্ম হয়েছে। নাম তার – মুকুল চৌধুরী।
মুকুলের বর্তমান সাফল্যের চাকচিক্য যতটা রঙিন, এর পেছনের ধূসর ইতিহাস ততটাই নির্মম। নিজের পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি করে দেওয়া, ঋণের জালে জড়িয়ে হাজতবাস, আর আত্মীয়দের বিদ্রূপ – এসবই ছিল মুকুলের ক্রিকেট স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জ্বালানি।
রাজস্থানের এক গ্রামের সেই ক্রিকেট পাগল বাবা দলিপ চৌধুরী যখন নিজের বাড়িটা মাত্র ২১ লাখ টাকায় হাতবদল করছিলেন, তখন সমাজ তাকে ‘উন্মাদ’ বলেছিল। আজ সেই পাগলামিই ইডেন গার্ডেন্সে ২ কোটি ৬০ লাখ রুপির মহাকাব্য হয়ে ফিরে এসেছে।

দলিপ বলেন, ‘বিয়ে করার আগেই স্বপ্ন দেখেছিলাম আমার ছেলে ক্রিকেটার হবে। শচীনকে দেখে বড় হওয়া মুকুল ২০১১ বিশ্বকাপে ধোনির সেই ছক্কা দেখে ভক্ত হয়ে গেল তার। সেই থেকেই শুরু।’
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের বিপক্ষে ব্যর্থতার পর হোটেলে ফিরে মুকুল যখন ডুকরে কাঁদছিলেন, দূর থেকে ভিডিও কলেই সেই নোনা জলের আঁচ পেয়েছিলেন পিতা। ফোনের ওপার থেকে শান্ত স্বরে প্রশ্ন এল, ‘বেটা, কেঁদে নিয়েছিস তো?’ সেই কান্নাটাই ছিল পরের ম্যাচের বারুদ।
মুকুল কথা দিয়েছিলেন, লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাকে যে মূল্যে কিনেছে, তার মর্যাদা তিনি মাঠেই দেবেন। আর সেই জেদই ইডেনের আকাশকে সাক্ষী রেখে ধোনিসুলভ এক অবিশ্বাস্য ইনিংসের জন্ম দিল।

মুকুল তার সামর্থ্যের প্রমাণ ব্যাট হাতে আগেই দিয়েছেন। ২০২৫-২৬ অনূর্ধ্ব-২৩ লিস্ট ‘এ’ ট্রফিতে ৬১৭ রান করে তিনি ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা। তার মারা ৩৯টি ছক্কা নির্বাচকদের নজর কেড়েছিল। এরপর সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে রাজস্থান কোচ অংশু জৈনের জহুরির চোখ চিনে নেয় এই রত্নকে।
সেই রত্ন আজ কেবল একটি নাম নয়, বরং এক অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক। ইডেন গার্ডেন্সের এই গগনবিদারী চিৎকার কেবল এক তরুণের শৌর্য ঘোষণা করেনি, বরং ঘোষণা করেছে এক নি:স্ব বাবার জেদের বিজয়।











