দুইশো বছর আগে বরফে ঢাকা আন্দেস পর্বত পাড়ি দিয়ে একজন মানুষ আর্জেন্টিনাকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন, নাম তার হোসে ডি সান মার্টিন। সেনাবাহিনী, ঠান্ডা, অক্সিজেনের অভাব, সবকিছু জয় করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়, শুধু বিশ্বাসের জোরে। দুই শতাব্দী পর ফুটবলের মাঠে ঠিক একই কাজ করলেন আরেকজন, লিওনেল স্কালোনি। যুদ্ধক্ষেত্র নয়, তার লড়াই ছিল একটা ভাঙা মানসিকতার বিরুদ্ধে, একটা জাতির অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে।
২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল, ২০১৫ আর ২০১৬ কোপা আমেরিকা ফাইনাল, প্রতিবারই আর্জেন্টিনা দরজার সামনে গিয়ে থমকে গেছে। মেসির চোখের জল তখন যেন পুরো জাতির কান্না। ৩৬ বছরের শিরোপা খরা, কোচ বদলের পর কোচ বদল, ড্রেসিংরুমে অবিশ্বাস, সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা তখন এক ক্লান্ত দল।
অথচ স্কালোনি নিজেও এই দলেরই একজন ছিলেন একসময়, শুধু অন্যভাবে। সান্তা ফে প্রদেশের ছোট্ট শহর পুহাতোর ছেলে, নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ থেকে শুরু করে দেপোর্তিভো লা করুনিয়ায় আট বছরের দীর্ঘ অধ্যায়, সেখানে লা লিগা আর কোপা দেল রে জেতা, এরপর ওয়েস্ট হ্যাম, লাৎসিও, মায়োর্কা, আতালান্তা ঘুরে ২০১৫ সালে বুট তুলে রাখা, রাইটব্যাক হিসেবে পরিশ্রমী কিন্তু কখনো তারকা নন। জাতীয় দলের হয়ে মাত্র সাত ম্যাচ, ২০০৬ বিশ্বকাপে তরুণ মেসির সতীর্থ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে যখন এই প্রায়-অচেনা মানুষটিকে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ করা হলো, প্রশ্ন উঠেছিল সর্বত্র, এত বড় দায়িত্ব সামলাবেন তিনি?

উত্তরটা স্কালোনি কথায় দেননি, দিয়েছেন কাজে। তিনি বদলে দিলেন আর্জেন্টিনার পরিচয়টাই। এটা আর শুধু মেসির দল নয়, এটা একটা দল, যেখানে মেসিও দলেরই একজন। ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজদের তুলে এনে অভিজ্ঞদের পাশে বসিয়ে গড়লেন এমন এক ড্রেসিংরুম, যেখানে একজনের ভুল ঢেকে দিতে ছুটে আসে আরেকজন। ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে আটাশ বছরের কোপা খরা কাটালেন, আর ২০২২ সালে কাতারে ফ্রান্সকে হারিয়ে এলো সেই ৩৬ বছরের প্রতীক্ষিত মুক্তি। ২০২৪ কোপা আমেরিকা প্রমাণ করল, এটা একবারের গল্প নয়, একটা সংস্কৃতি।
২০২৬ বিশ্বকাপেও প্রশ্ন উঠেছিল, মেসির বয়স, চোট, নতুন প্রজন্ম, সব মিলিয়ে পথ কি কঠিন হবে? চোট পাওয়া মেসি খেলবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন খেলোয়াড়ের হাতেই, জোর করেননি, শুধু পাশে থেকেছেন। প্রতিদানে মেসি পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে গোল করে গেছেন, আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে পিছিয়ে থেকেও দলকে টেনে তুলেছেন ফাইনালে। প্রতিপক্ষ এবার স্পেন।
একজন অচেনা রাইটব্যাক থেকে একজন অন্তর্বর্তীকালীন কোচ, আর সেখান থেকে একটা জাতির ভয় দূর করা স্থপতি, এই যাত্রাটাই বলে দেয় কেন লিওনেল স্কালোনি আজ শুধু একজন কোচ নন। প্রশ্ন একটাই, ইতিহাসের পাতায় যে জায়গাটা তিনি এত সাহসে গড়ে তুলেছেন, সেখানে কি আরেকটা শিরোপা যোগ হবে তার নামের পাশে?












