মারমুখী ব্যাট চালালেন। বাইশ গজে রীতিমত ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করলেন। রণক্ষেত্র বানিয়ে ফেললেন রাজশাহীর বাইশ গজ। মাত্র ১২ বলে ৩০ রান—এমন বিদ্ধংসী এক নক খেলে ম্যাচের ভাগ্য নিজের মুঠোয় টেনে নিলেন মাহফিজুল ইসলাম রবিন। শেষ পর্যন্ত তিনিই ঢাকা মেট্রোর জয় নিশ্চিত করলেন সাত উইকেট হাতে রেখেই।
শেষ ওভারে স্পিড স্টার রানাকে টানা দুই চার হাঁকিয়ে ম্যাচকে কার্যত শেষ করে দিলেন। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় দুই রান নিয়ে জয় তুলে দিলেন ঢাকা মেট্রোকে, বনে গেলেন জয়ের নায়ক।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে মাহফিজুুল ইসলাম রবিন কোনো উড়ে এসে জুড়ে বসা চরিত্র নয়। বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট কাঠামোর প্রোডাক্ট তিনি। ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে উঠেছেন বিকেএসপিতে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ খেলেছেন এই ডানহাতি ওপেনার।

কিন্তু, রবিনের গল্পটা শুধু এক ম্যাচের নয়। এর শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় বছর কয়েক আগে, এক ছোট্ট ছেলের কাছে—যে দুই বছর বয়সেই হারিয়েছে বাবাকে। বাবাহীন জীবনের শূন্যতা, সংসারের কষ্ট, মায়ের অশ্রুভেজা চোখ—সবকিছু মিলে ক্রিকেট তার কাছে তখনও ছিল বিলাসিতা। পড়াশোনা করে চাকরি করাই যেন ভাগ্যে লেখা ছিল। তবুও, পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে ২২ গজের টান আর আটকাতে পারেননি।
পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে টিফিনের টাকা জমিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা ক্রিকেট একাডেমিতে। পাশে ছিলেন বড় বোন পপি আক্তার, আর পরবর্তী সময়ে আশ্রয় হয়ে দাঁড়ালেন দুলাভাই জাহাঙ্গীর আলম। মায়ের মমতা তখন রূপ নিলো ত্যাগে—চোখের ডাক্তার দেখানোর জন্য জমানো টাকা দিয়ে কিনে দিলেন ছেলের ব্যাট। সেই ব্যাটই ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে লাগল রবিনের আজকের রূপ।
দিনাজপুরের বিকেএসপি থেকে শুরু, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলা, এরপর এইচপি ইউনিট আর ইমার্জিং দলে ধারাবাহিকতায় নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়া—রবিন থামেননি কোথাও। সর্বশেষ ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ খেলেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে। সেখানে ১১ ম্যাচে ৫১২ রান করেন, ৪৬.৫৪ গড় নিয়ে।

তখন থেকেই নির্বাচকদের সুনজর পেতে শুরু করেছেন ২১ বছর বয়সী রবিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স ইউনিট দলের সদস্য। ইমার্জিং দলের হয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে এই রাজশাহীতেই খেলেন ৮৭ রানের ইনিংস। গত আগস্টে জাতীয় দলের প্রস্তুতি ম্যাচে সাত চার ও এক ছক্কায় ২৭ বলে ৪৪ রানের ইনিংস খেলে নিজেকে জানান দেন আরেকবার।
এবার রাজশাহীর আকাশের নিচে তাঁর ব্যাটে যে ঝড় উঠল, তাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটেও নতুন এক স্বপ্নের জানালা খুলে গেল। এই রবিনকে যেতে হবে বহুদূর!










