সবুজ মাঠে তিনি দেখান না ড্রিবলিংয়ের নান্দনিকতা। পায়ে নেই তেমন ঝোড়ো গতিও। তবুও তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের কাছে ছিলেন নির্মম যমদূত! নাম তাঁর, জার্ড মুলার। ফুটবল বিশ্ব যাঁকে চেনে ‘ডার বোম্বার’ নামে!
তবে, অলিম্পাসের দেবতা সম্ভবত, জার্ড মুলারকে একটু ভিন্ন ধাতুতে গড়তেই মনোযোগী হয়েছিলেন। একারণেই, ফুটবলপ্রেমীরা তাঁর পা থেকে হরহামেশাই ড্রিবলিং কিংবা গতির কারিকুরি দেখার সুযোগ পেতেন না। কিন্তু তারপরও ফুটবলে স্রেফ সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছে সঠিক স্পর্শে বল জালে জড়ানোকে কেউ যদি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে থাকেন, সেটা এই জার্ড মুলারই।
তাঁর নাকি প্রথাগত ট্যাকটিক্যাল স্কিল নেই কিংবা দর্শনীয় শটে লক্ষ্যভেদ করে দর্শকদের মাতান না এমন বহু বদনামকে তুড়ি মেরে তিনি বছরের পর বছর দুর্দান্ত খেলে গেছেন। যমদূতের মতো একেবারে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছে ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে ধারাবাহিকভাবে গোল করে যাওয়াই যেন ছিল এই জার্মান কিংবদন্তির একমাত্র উদ্দেশ্য!

মুলারের খেলার মূলমন্ত্রই ছিল কম শ্রমে সর্বোচ্চ কার্যকারিতা বের করে আনা। তাই মাঠের সর্বত্র অযথা দৌড়ে তিনি নিজের শক্তি অপচয় করতেন না। তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র ছিল মূলত ১৮ গজের পেনাল্টি বক্সের আশপাশেই। তিনি সেখানে ওঁত পেতে থাকতেন প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায়। শরীরের ভারসাম্য রক্ষায়ও অসীম পারদর্শী ছিলেন তিনি। অতি অল্প জায়গায় কড়া পাহারার মধ্যেও তিনি অবলীলায় প্রয়োজনমাফিক শরীর ঘুরিয়ে খুঁজে নিতেন জালের ঠিকানা।
বলের গতিবিধি আগে থেকে বুঝতে পারার অলৌকিক ক্ষমতাও তাঁকে এগিয়ে দিয়েছিল বৈকি! প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা যখন কেবল বলের দিকে তাকিয়ে ভাবতেন: বল কখন, কোথায় পৌঁছাবে— মুলার ততক্ষণে সঠিক জায়গায় পৌঁছে চোখের পলকে করতেন লক্ষ্যভেদ।
আর গোল করার জন্য তাঁর প্রথাগত সুন্দর শটের প্রয়োজন হতো না। কারণ, হাঁটু, উরু, গোড়ালি কিংবা পায়ের পাতা—দেহের যেকোনো অংশ দিয়েই নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তাঁর জুড়ি ছিল মেলা ভার।

জার্ড মুলারের ফুটবলে হাতেখড়ি হয় মূলত ১৯৫৮ সালে। জন্মস্থানের ক্লাব নর্ডলিনজেনের যুবদলের হয়ে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি খেলেন স্থানীয় টুর্নামেন্ট ও লিগে। কিশোর মুলার তখনও গড়পড়তা এক খেলোয়াড় ছিলেন।
কিন্তু তিনি লাইমলাইটে আসেন স্থানীয় ব্যাভারিয়ান লিগে নর্ডলিনজেনের হয়ে ১৯৬৩ সালে অভিষেক হওয়ার পর। প্রথম মৌসুমেই তিনি ৩১ ম্যাচে ৫১ গোল করে তাক লাগিয়ে দেন বায়ার্নলিগায়!
ফলাফল? পরবর্তীতে জার্মান বুন্দেসলিগার সফলতম দলে পরিণত হওয়া বায়ার্ন মিউনিখ ছোঁ মেরে নিজেদের দলে ভেড়ায় তাঁকে। ব্যস! আর পিছনে ফিরতে হয়নি মুলারকে।

মুলার, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার আর সেপ মায়ারের কারিকুরিতে এক মৌসুম বাদেই দ্বিতীয় বিভাগ থেকে বুন্দেসলিগায় উত্তীর্ণ হয় বায়ার্ন। এরপর ষাট ও সত্তরের দশকজুড়ে বায়ার্নের হয়ে ১৩টি শিরোপা জয় করেন জার্ড মুলার। এ সময়ে, তিনি পরিপূর্ণ এক গোল মেশিনে পরিণত হন।
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ১৫ মৌসুম খেলে ৬০৫ ম্যাচে ৫৬৪ গোল করেন মুলার। ক্লাবে তাঁর জেতা শিরোপার মধ্যে আছে: চারটি বুন্দেসলিগা, চারটি ডিএফবি পোকাল কাপ, এবং তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ। এছাড়া কাপ উইনার্স কাপ ও ওয়ার্ল্ড ক্লাব কাপও জেতেন তিনি।
সেই বছরই মেক্সিকো বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দ্যুতি ছড়ান জার্ড মুলার। ১৯৬৬ সালে পশ্চিম জার্মানি জাতীয় দলে ডাক পেলেও, নিজেকে মেলে ধরতে পারছিলেন না তিনি। অবশেষে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে আসে তাঁর মাহেন্দ্রক্ষণ। ৬ ম্যাচে ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ক্লাব ও জাতীয় পর্যায়ে অতিমানবীয় এই গোল করার ক্ষমতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭০ সালে তাঁর হাতে ওঠে ব্যালন ডি’অর।

গোল করার এই ধারাবাহিকতা পরবর্তী মৌসুমগুলোতেও অব্যাহত থাকে মুলারের। ১৯৭১-৭২ মৌসুমেই বুন্দেসলিগায় বায়ার্নের হয়ে রেকর্ড ৪০ গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি। আর ১৯৭২ সালে এক ক্যালেন্ডার বছরে তো সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে রেকর্ড ৮২ গোল করে বসেন এই ডাই ম্যানশ্যাফট স্ট্রাইকার। চার দশক পর ২০১২ সালে আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসি ভাঙেন এই রেকর্ড। তিনি সাত বার বুন্দেসলিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং দুই বার দর্শকদের ভোটে জার্মানির সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন।
দেশের হয়েও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। সত্তর বিশ্বকাপের পর ১৯৭২ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ১৮ বছর পর জার্মানদের বড় শিরোপা এনে দেন তিনি।
এরপর ১৯৭৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে উড়তে থাকা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও লক্ষ্যভেদ করে বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেন তিনি। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে সেসময়ে রেকর্ড ১৪টি গোল ছিল তাঁর। পশ্চিম জার্মানির জার্সিতে ৬২ ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে ৬৮ গোল করেছেন এই ড্যাশিং তারকা। মাত্র ২৮ বছর বয়সেই তিনি জাতীয় দল থেকে অবসর না নিলে, সংখ্যাটা হয়ত পৌঁছাত আরও উঁচুতে।

গতি আর প্রথাগত স্কিলের অভাবের সব বদনামের জবাব ক্যারিয়ারজুড়ে জার্ড মুলার দিয়েছেন বছরের পর বছর লাগাতার গোল করে যাওয়ার নজির গড়ে। তিনি প্রমাণ করেছেন, ফুটবল দিনশেষে গোলের খেলা। আর সেই গোলের খেলায় তিনিই অবিসংবাদিত সম্রাট, প্রতিপক্ষ রক্ষণের নির্মম যমদূতও তিনিই!










