মাঠ থেকে বিদায় না বলার ‘অপ’ সংস্কৃতি!

ক্যারিয়ারের শুরুটা যেমন হয় আয়োজন করে, তেমনই শেষটাও হওয়া উচিত স্মরণীয়। স্বপ্ন, সাফল্য, না পাওয়ার আক্ষেপ—এসব নিয়েই তো একদিন বিদায় বলতে হয় সবাইকে। কেউ চলে যান কাঁধে গার্ড অব অনারের সম্মান নিয়ে, কেউবা স্রেফ একটা সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে। তবে ক্রিকেটের মতো আবেগমাখা খেলায় বিদায়ও যেন একটা দৃশ্যমান উৎসবের মতো হওয়া উচিত।

ক্যারিয়ারের শুরুটা যেমন হয় আয়োজন করে, তেমনই শেষটাও হওয়া উচিত স্মরণীয়। স্বপ্ন, সাফল্য, না পাওয়ার আক্ষেপ—এসব নিয়েই তো একদিন বিদায় বলতে হয় সবাইকে। কেউ চলে যান কাঁধে গার্ড অব অনারের সম্মান নিয়ে, কেউবা স্রেফ একটা সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে। তবে ক্রিকেটের মতো আবেগমাখা খেলায় বিদায়ও যেন একটা দৃশ্যমান উৎসবের মতো হওয়া উচিত।

বিশ্ব ক্রিকেটে অনেক মহাতারকার শেষ ম্যাচের দৃশ্য চোখে ভাসে—গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ, সতীর্থদের কাঁধে উঠে সম্মানের শেষযাত্রা, কিংবা দর্শকদের করতালির মাঝে ধীর পায়ে প্যাভিলিয়নে ফেরা। শচীন টেন্ডুলকার, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে — তাঁরা মাঠে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে কেঁদেছেন, দর্শকরাও কেঁদেছে তাঁদের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটে? এখানকার গল্পটা অন্যরকম, একটু করুণ, একটু অবহেলার।

মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম—তাঁরা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের উজ্জ্বল নাম। কিন্তু তাঁদের বিদায়ের গল্পটা কি তেমনই গর্বের? অনেকেই চলে গেছেন নীরবে, কারও বিদায়ের ঘোষণা এসেছে ফেসবুক পোস্টে, কেউ আবার মাঠে থেকেও বুঝতে পারেননি এটাই হয়তো তাঁর শেষ ম্যাচ! কেন এমন অপসংস্কৃতি? এর পেছনে মূলত কয়েকটি কারণ।

প্রথমত, দেশের ক্রিকেটের অপসংস্কৃতি—যেখানে অভিজ্ঞদের সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানোর কোনো রীতি গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কখনোই কোনো ক্রিকেটারকে উপযুক্ত বিদায় দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যখন কেউ বুঝতে পারে যে তাঁর সময় শেষ, তখন বোর্ড, টিম ম্যানেজমেন্ট ও ভক্তরা সেটাকে সম্মানের সঙ্গেই মেনে নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে? এখানে সিদ্ধান্ত নেন নেটিজেনরা!

দ্বিতীয়ত, সময়মতো বিদায় বলার ব্যর্থতা। দেশের অনেক ক্রিকেটারই তাঁদের ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করে এসে বুঝতে পারেন না কখন থামতে হবে। ফর্মহীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়েও তাঁরা খেলে যেতে চান, কারণ যোগ্য বিকল্প তৈরি হয়নি। কিন্তু দোষটা কি শুধু ক্রিকেটারদের?

না, এর জন্য বোর্ডও সমানভাবে দায়ী। বিসিবি কখনোই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে না, যোগ্য বিকল্প খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তাই তো ৩৬-৩৭ বছর বয়সেও ক্রিকেটাররা মনে করেন, তাঁরা খেলার জন্য উপযুক্ত।

তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব। সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড, সমালোচনা আর বিদ্রুপের চাপে ক্রিকেটাররা সিদ্ধান্ত নিতে দোটানায় পড়ে যান। তাঁদের বিদায় যেন নির্ধারণ করে দেয় সমর্থকদের বিতর্ক আর ট্রল। অথচ বিদায় বলা উচিত নিজেদের শর্তে, নিজের সিদ্ধান্তে, গর্বের সঙ্গে।

বিশ্ব ক্রিকেটে যারা কিংবদন্তি হয়ে থাকবেন, তাঁরা বিদায়ের সময়ও মাথা উঁচু রেখে মাঠ ছেড়েছেন। তাঁদের বিদায়ও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার গল্প। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে সেটা হয় না, বরং কারও বিদায়ের পর সেটাই হয়ে যায় বিতর্কের বিষয়।

এই অপসংস্কৃতি বদলাতে হবে। যারা বছরের পর বছর দেশের জন্য লড়েছেন, তাঁদের উচিত মাঠ থেকেই বিদায় বলা—ভক্তদের বিদায় জানানোর সুযোগ করে দেওয়া। ক্রিকেটারদেরও বোঝা উচিত, সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিতে জানাটা একটা শিল্প। আর ক্রিকেট বোর্ডেরও দায়িত্ব, খেলোয়াড়দের সেই সুযোগটা তৈরি করে দেওয়া।

সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। নয়তো একদিন আফসোস নিয়েই বিদায় নিতে হয়—গার্ড অব অনারের বদলে ফেসবুক পোস্টে, গ্যালারির করতালির বদলে ঠাণ্ডা সমালোচনার মাঝে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link