গৌতম গম্ভীর—একজন সত্যিকারের নাইট, যিনি বদলে দিয়েছেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের ভাগ্য। কেকেআরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আঠারো বছরের। কখনও খেলোয়াড়, কখনও অধিনায়ক, আর শেষে পরামর্শক হিসেবে—প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি কেকেআরকে দিয়েছেন নতুন রূপ, নতুন মানে। সম্পর্ক এখন ছিন্ন হয়ে গেলেও গৌতমই যেন কলকাতার প্রতিশব্দ।
২০১১ সালে যখন গৌতম গম্ভীর কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন দলটা ছিল হারিয়ে যাওয়া। সৌরভ গাঙ্গুলীর বিদায়ের পর ভক্তরা ছিলেন হতাশ, দলের মধ্যে ছিল আত্মবিশ্বাসের অভাব। প্রতিভা ছিল, কিন্তু দিকনির্দেশনা ছিল না।
গম্ভীর এসে সেটাই বদলে দিলেন। তিনি কেবল ক্রিকেটার হিসেবে নয়, এক নেতা হিসেবে দলকে নতুন করে গড়ে তুললেন। তিনি খেলোয়াড়দের শিখিয়েছিলেন বিশ্বাস করতে, ঝুঁকি নিতে, জিততে চাওয়া মনোভাব রাখতে। নিজের ব্যাটিং অর্ডার পর্যন্ত বদলে তরুণদের সুযোগ দিয়েছিলেন, যাতে তারা নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পায়।

২০১২ সালে সেই নেতৃত্বের ফল মিলল। গম্ভীরের কেকেআর প্রথমবারের মতো আইপিএল জিতল। পুরো মৌসুমে ১৭ ম্যাচে ৫৯০ রান করে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটার। তাঁর নেতৃত্বে কেকেআর হয়ে উঠল আত্মবিশ্বাসী, সংগঠিত এবং জয়ের জন্য ক্ষুধার্ত এক দল।
২০১৪ সালেও তাঁর নেতৃত্বে কেকেআর আবার চ্যাম্পিয়ন হয়। যদিও মৌসুমের শুরুটা ছিল ভয়ানক—টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে আউট হন গম্ভীর। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি দলকে একত্র করলেন, অনুপ্রেরণা দিলেন, আর কেকেআর জিতে ফেলল টানা সাতটি ম্যাচ।
ফাইনালে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার ট্রফি তুলে ধরল দলটি। গম্ভীর প্রমাণ করলেন, নেতৃত্ব মানে কেবল ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নয়—নেতৃত্ব মানে বিশ্বাস, ধৈর্য, আর দলকে নিজের পরিবারের মতো আগলে রাখা। অবসর নেওয়ার পরও গম্ভীরের কেকেআর অধ্যায় শেষ হয়নি।

২০২৩ সালে তিনি পরামর্শক হিসেবে ফিরে আসেন। তাঁর ফিরে আসার পরই যেন পুরনো আত্মা ফিরে পায় কেকেআর। ২০২৩ সালে সপ্তম স্থানে থাকা দলটি ২০২৪ সালে হয়ে যায় আইপিএল চ্যাম্পিয়ন। তাঁর অন্যতম সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল মিশেল স্টার্ককে ২৪.৭৫ কোটি টাকায় দলে নেওয়া—যা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল।
কিন্তু গম্ভীর জানতেন, এই বিনিয়োগই শেষ পর্যন্ত জয়ের চাবিকাঠি হবে। স্টার্ক ১৭টি উইকেট নিয়ে ফাইনাল ও কোয়ালিফায়ারে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স দেন, গম্ভীরের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখেন। গম্ভীরের আরেকটি বিশেষত্ব ছিল পুরনো নায়কদের নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন।
সুনীল নারিনকে তিনি আবার ওপেনিংয়ে নামালেন—ফল, ৪৮৮ রান, ১৭ উইকেট আর তৃতীয়বারের মতো আইপিএলের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়ের পুরস্কার। আন্দ্রে রাসেলও ফিরে পেলেন নিজের হারানো আগ্রাসন।

চেন্নাইয়ে ফাইনালে যখন কেকেআর ট্রফি তুলল, তখন সেটা শুধু এক মৌসুমের সাফল্য নয়, ছিল এক যুগের উত্তরাধিকার। গৌতম গম্ভীরের নেতৃত্বে কেকেআর আবার খুঁজে পেল নিজের পরিচয়—আত্মবিশ্বাসী, আক্রমণাত্মক, আর জয়ের জন্য ক্ষুধার্ত এক দল।
গম্ভীরের কেকেআর অধ্যায় তাই শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়, এটা এক অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি এক হারিয়ে যাওয়া দলকে বিশ্বাস শিখিয়েছেন, নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন, আর পুরো শহরকে আবার গর্বের কারণ দিয়েছেন। গৌতম গম্ভীর—একজন সত্যিকারের নাইট, যিনি প্রমাণ করেছেন নেতৃত্ব মানে শুধু মাঠে কৌশল নয়, মানে মন জয় করার ক্ষমতা।










