ভিন্ন মাঠ, আলাদা বল। দুই সময়ের প্রান্তে দাঁড়ানো দুটি সম্পর্ক—গুরু এবং শিষ্য। ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর, দুবাইয়ের মাঠ। শাহীন শাহ আফ্রিদির ১৩৮ কিমি গতির ভেসে আসা বাউন্সারকে অভিষেক শর্মা আলতো ছোঁয়ায় মাঠের বাইরে উড়িয়ে দিলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে শুভমান গিলও একই কাজ করলেন। স্টেডিয়ামের দোতলায় আছড়ে ফেললেন বল। এর পেছনের কারিগর অবশ্য অন্য মানুষ—নামটা যুবরাজ সিং।
শুরুতেই যে দু’টো মুহূর্তের কথা বর্ণনা দিলাম, সেটা কি কেবল দুই ছক্কা? না। এ দুটি মুহূর্ত, দুই সময়ের মধ্যে একটি রেখা টানছে—২০০৭ সালের ডারবানের মাঠে যুবরাজ সিং ব্রেট লিকে একইভাবেই তো হাঁকিয়েছিলেন ১১১ মিটার লম্বা ছক্কা।

আর এই তিন ঘটনা তো গুরু-শিষ্যের মহাকাব্যিক যোগের গল্প। যুবরাজের মন্ত্রে তৈরি হচ্ছে নতুন যুগের ব্যাটসম্যান, আর মাঠের প্রতিটি ছক্কা তো সেই মন্ত্রের প্রতিধ্বনি।
যুবরাজের কাহিনী নাটকের চেয়েও নাটকীয়। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই, বিশ্বকাপ জয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন—সবই তাঁকে করেছে এক কিংবদন্তি। তবে সবচেয়ে বড় যাদু তার হাতে নয়, তার মস্তিকে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি, ভারতের অধিনায়ক হবার সম্ভাবনা, বড় বড় সব সুযোগ-সুবিধা, সব কিছু ভেসে গেছে সময়ের নদীতে, কিন্তু যুবরাজ ছিলেন স্থির—নিজেকে মঞ্চস্থ করেছেন ঘাম ঝরানো মাঠে, প্রতিভার অনুসন্ধানেই কাঁটিয়েছেন জীবনের মূল্যবান সময়।

অভিষেক ও শুভমান সেই অনুসন্ধান থেকেই জন্মেছে। যুবরাজ তাদেরকে শুধু ব্যাটিং শেখাননি, শৃঙ্খলা, ধৈর্য, সিদ্ধান্তগ্রহণ, মানসিক দৃঢ়তা—সবই শিক্ষা দিয়েছেন হাতে-কলমে। অভিষেককে নিজের বাড়িতে দিনের পর দিন অনুশীলন করিয়েছেন।
মোবাইল কেড়ে, পার্টি থেকে দূরে রেখে, এমনকি গাড়িতে বসিয়ে কিটব্যাগও নিজেই বহন করেছেন। তিনি শিষ্যকে শিখিয়েছেন পিছনের পায়ে ভর দিয়ে ছক্কা মারার কৌশল—এটাই তো আজ অভিষেককে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বানিয়েছে ভয়ংকর এক নাম।
বাবার কঠোর শাসনে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে যুবরাজকে। সেখান থেকেই তো শিখেছেন শৃঙ্খলার মূলমন্ত্র। বাবার দুচোখে ধারণ করা স্বপ্ন থেকেই তো সফলতা ধরতে পেরেছেন। আর এখন নিজেই বনে গেছেন স্বপ্ন দেখানোর কারিগর।

তাই তো শুভমানও শুধু ব্যাটিংটা শেখেননি, যুবরাজের হাতে তৈরি হয়েছেন একজন নেতা হিসেবে। চাপ সামলানো, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, দলের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া—সবই তার মানসিক জাদুর অংশ। যুবরাজের ছায়া তলে বেড়ে উঠেছেন নীরবে, সময়ের সঙ্গে হয়েছেন ধারাল এবং পরিণত।
তবে যুবরাজের কাজ তো এখানেই থেমে থাকলে চলে না। জহুরি চোখ দিয়ে যে আরও খুঁজতে হবে সোনার খনি। ইতিমধ্যেই অবশ্য পেয়েছেন পাঞ্জাবের আরও দুই প্রতিভা প্রিয়ানশ আরিয়া এবং প্রভসিমরান সিংকে। যুবরাজের তত্ত্বাবধানে যারা হতে চলেছেন আগামীর অশ্বারোহী।
তবে পুরোনো শিষ্যদের রণক্ষেত্রে ছেড়ে দিলেই যে দায়িত্ব শেষ নয়। ফলাফলের দিকেও রাখতে হবে নজর। তাই তো এখনও নজরে রাখছেন প্রিয় শিষ্যদের। এখনও যে বহু দূর চলা বাকি, মহাকাব্যিক সব গল্পের জন্ম দেওয়া বাকি।

অভিষেক-গিলরা যখন মাঠে ঝড় তুলছেন, ছক্কা হাঁকাচ্ছেন, যুবরাজ হয়তো দূর থেকে দেখে মনে মনে হাসছেন। হয়তো মনকে বলছেন, ‘এভাবেই তো তৈরি হবে ক্রিকেটের যুবরাজরা।’











