এ মিরাজ কেমন মিরাজ?

ব্যাটিং টেকনিক দেখে কোনোভাবেই মনে হওয়ার জো নেই, তিনি একজন প্রপার ব্যাটার। তিনি আসলে দায়িত্ব পালন করছেন টেলএন্ডারের, যেখানে ১০-১২টা বল টিকে থাকলেই সাধুবাদ পাওয়া যায়।

উদ্ধারকারী জাহাজ উদ্ধার করতে এসে নিজেই তলিয়ে গেল। এই লাইনটা মেহেদী হাসান মিরাজের জন্য প্রযোজ্য। তিনি ব্যাট হাতে নামবেন, দলের বিপদ বাড়িয়ে দিয়ে চলে যাবেন। ব্যাটার মিরাজের রোলটাই আসলে এমন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। নামে ব্যাটার হলেও তাঁর মাঝে বিরাজমান টেলএন্ডারের অস্তিত্ব।

৪১তম ওভারে আসা একজন সাত নম্বর ব্যাটারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী? ২০ বল খেললে ৪০ রান করবে। আধুনিক জামানার ক্রিকেটে তো এমনটাই ঘটে। তবে ব্যাটার যদি হয় মেহেদী হাসান মিরাজ, তাহলে নিশ্চয় প্রত্যাশার জায়গাটা সংকীর্ণ হয়ে আসে! মিরাজ আসলে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে রানের সংখ্যাটাকেই সংকীর্ণ করার জন্য ক্রিজে আসেন।

জ্বলন্ত উদাহরণ, তাওহীদ হৃদয় যখন আউট হয়ে সাজঘরে ফিরলেন, সেই পথেই মিরাজ এলেন। দলীয় রান তখন ২১৫ আর হারাতে হয়েছে পাঁচ উইকেট। বলে রাখা ভালো, তখন চলমান ৪১তম ওভার। নম্বর সেভেন ব্যাটারের জন্য এর থেকে আদর্শ মঞ্চ আর হয় কি?

মিরাজের কাজটা তখন খুবই সহজ, ১৫-২০ বল খেলে ব্যক্তিগত স্কোরটা নিদেনপক্ষে ২৫-৩০ করলেই যথেষ্ট, মিরাজের কাছে এর থেকে বেশি আশা করাটাও তো বোকামি। তবে মিরাজ যা করলেন, তাতে ক্রিকেট দর্শনের তত্ত্বটাও বোকা বনে যাবে।

১২ বল থেকে করলেন মাত্র তিন রান। স্ট্রাইক রেট ২৫। বাংলাদেশের যে মোমেন্টাম ছিল, সেটাকে একেবারে ধুলিসাৎ করে দিয়ে ফিরে এলেন। আরও মজার ব্যাপার, মিরাজের সেই অপূর্ণ কাজ, ফেলে রাখা দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন তাসকিন আহমেদ। ১৬ বলে ২০ রানের ইনিংস খেলে মিরাজকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন কীভাবে ব্যাট করতে হয়।

বাংলাদেশ দিনশেষে স্কোরবোর্ডে তুলেছে ২৮৪ রান। অন্তত ২০ থেকে ২৫ রান কম করেছে, আর যার কারিগর কাপ্তান মেহেদী হাসান মিরাজ। এটা একদিনের গল্প নয়, বিগত এক-দেড় বছর ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। ব্যাটিং টেকনিক দেখে কোনোভাবেই মনে হওয়ার জো নেই, তিনি একজন প্রপার ব্যাটার। তিনি আসলে দায়িত্ব পালন করছেন টেলএন্ডারের, যেখানে ১০-১২টা বল টিকে থাকলেই সাধুবাদ পাওয়া যায়।

একজন ব্যাটারের ব্যাটপ্যাঁচ যাবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে যখন আপনি উইকেটে দাঁড়িয়ে সাত নম্বর পজিশনে ১২টা বল খেলে ফেলবেন, সেখানে ২৫-৩০ রান না হোক অন্তত ১৫ রান করাই যায়। তবে মিরাজের ক্ষেত্রে সমস্যাটা তাঁর টেলএন্ডার মানসিকতা। তিনি যেন ভয় পাচ্ছেন, বারবার বুঝিয়ে যাচ্ছে তাঁর জন্য এই জায়গাটা না।

আরও ভয়াবহ ব্যাপার, এমন একজন পারফর্মার দলের ক্যাপ্টেন। দলে জায়গা পাওয়ার মতোই অবস্থান যার এই মুহূর্তে নেই, তার ওপর ওয়ানডে দলের ভার, ভাবা যায়? বিপরীতে বলতে পারেন, বল হাতে তো মিরাজ বেশ কার্যকর, এমনকি অধিনায়ক হিসেবে ফলাফল আসছে!

এটাকেও ভাঙার মতো পর্যাপ্ত যুক্তি আছে। ব্যাটার সত্তা বাদ দিলে মিরাজ মূলত অফস্পিনার, বেশ কার্যকরীও। তবে যদি একজন স্পিনার হিসেবেই তাঁকে নিতে হয়, সেক্ষেত্রে তাঁর পজিশন হওয়া উচিত আট কিংবা নয়। কোনোভাবেই সাত নম্বর পজিশন নয়।

বলতে পারেন, এই মিরাজের তো ওয়ানডেতে ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরিও আছে। সেকাল হয়েছে বাসি, তখনকার সেটআপ আর এখনকার সেটআপে বিস্তর ফারাক। বলা বাহুল্য, সেঞ্চুরি হাঁকানো মিরাজের যতটুকু উন্নতি করা দরকার ছিল ব্যাট হাতে, সেটা তো হয়নিই, বরং অবনতির পাল্লাটাই ভারি।

অধিনায়কত্ব প্রসঙ্গ টানলে, দলে পরীক্ষিত সব অধিনায়ক চোখের সামনেই আছে। যারা সামনে থেকেই দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর ফলাফলের প্রসঙ্গেও একই কথা, বাংলাদেশ খেলছে একটা ইউনিট হয়ে। মিরাজের অধিনায়কত্বের তারিফ করতেই হয় তবে, জাতীয় দলে এখন আর ক্যাপ্টেন কোটায় খেলার সুযোগটা একেবারেই নেই।

এই মিরাজকে দিয়ে আসলে কী করবেন আপনি? ভুল শুধরে দেবেন, সমালোচনা করবেন নাকি দল থেকে ছেঁটে ফেলবেন? যেটাই করুন না কেন শুরুর লাইনটা আরও একবার বলতে হয়, উদ্ধারকারী জাহাজই যখন তলিয়ে যায়, তখন কিছুই বলার থাকে না।

লেখক পরিচিতি

স্টাফ রিপোর্টার

Share via
Copy link