নি:শব্দ বজ্রপাতের মত তলোয়ার সংবরণ

এত দ্রুত চলে যাওয়া যায় না — চাইলে বলা যায়। প্রতিবাদ করা যায়। রাজার পথ আগলে রাখা যায়। তবে, এই মুহূর্তে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া, আর কিছু করার নেই। বরং, এই বিদায়টা রাজসিক কায়দায় উদযাপন করাই শ্রেয়।

৭৭০ রান! অনন্য এক মাইলফলকের ৭৭০ রান। অথচ কি অবলীলায় বিদায় বলে দিলেন। রাজার পরিচয় মাইলফলকে নয়, তাঁর ওই রাজমুকুটে। ওই মাথাটা যতদিন উঁচু আছে ততদিনই শাসন আছে। আর এই শাসনের নামই বিরাট কোহলি।

একটা সময় ছিলো, যখন নামের পাশে শুধুই বিতর্ক লেখা হতো। অধিনায়কত্ব নিয়ে দ্বিধা ছিল, ব্যাট হাতে স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিলো। অথচ তিনিই হয়ে গেলেন ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়ক। নাম — বিরাট কোহলি।

৯২৩০ রান। ৩০টা শতরান। ৩১টা হাফ-সেঞ্চুরি। সাতটা ডাবল সেঞ্চুরি। ২০ টা শতরান করলেন অধিনায়ক হিসেবে — যা কিনা ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে অভূতপূর্ব! তবু থেমে গেলেন, যখন আর মাত্র ৭৭০ রান দূরে ছিলেন দশ হাজার টেস্ট রানের মাইলফলক থেকে। কে ভাবে এমন বিদায়? বিরাট কোহলি ভাবেন।

কারণ তিনি সবসময় মাইলফলকের চেয়ে বড় কিছুতে বিশ্বাস করতেন। দলের জয়। ক্রিকেটের সৌন্দর্য। নিজের সম্মান। তাঁর ভেতরে লুকিয়ে ছিলো এক রাজপুত যুদ্ধের আত্মা — চোখে আগুন, হাতে ব্যাট নয় যেন তরবারি! প্রতিপক্ষকে শাসন করেছেন, দলের জন্য পুড়ে ছাই হয়েছেন, মাঠে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছেন।

আর যখন বুঝলেন, যুদ্ধটা যথেষ্ট হয়ে গেছে — অবলীলায় বলে দিলেন বিদায়। না, ফেয়ারওয়েল ম্যাচ চাইলেন না। না, মাইলফলকের জন্য আরেকটা সিরিজ খেলতে চাইলেন না। তিনি বুঝে গেছেন, ওই যুদ্ধ জয়ের আনন্দ তাঁর সাঙ্গ হয়েছে — এবার বাড়ি ফেরার পালা। ফেরার আগে দিল্লীর সেই কথিত বখাটে ছেলেটা গোটা ক্রিকেট বিশ্বের মনের রাজত্বে স্থান করে নিয়েছেন।

কিংবদন্তিরা এমনই হন। তাঁদের বিদায়ও হয় কিংবদন্তির মতো। একটা সময়ের পর পরিসংখ্যান তাঁদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয় না — বরং তাঁরাই হয়ে যান পরিসংখ্যানের সীমা ছাড়ানো এক মহাকাব্য।

কোহলি তেমনই এক মহাকাব্য। যার শেষ অধ্যায়টাও ছিলো এক নি:শব্দ বজ্রপাত। শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে তাঁকে বোঝা যায় না। তাঁকে বুঝতে হয় হৃদয়ে। যুদ্ধের আবেগে। গর্বের গর্জনে। তাঁর বিদায় কোনো কিছুর ‘শেষ’ নয়, বরং একটা যুগের ‘সমাপ্তি’।

এত দ্রুত চলে যাওয়া যায় না — চাইলে বলা যায়। প্রতিবাদ করা যায়। রাজার পথ আগলে রাখা যায়। লাভ কি? রাজা যখন নতুন রাজ্য জয়ে আর আনন্দ খুঁজে পান না, সিংহাসন ছেড়ে দেন পরবর্তী কোন প্রজন্মের জন্য, তখন এই বিদায়টা রাজসিক কায়দায় উদযাপন করাই শ্রেয়।

তাতেই বরং রাজার শ্রেষ্ঠত্ব বাড়ে। রাজারা এভাবেই সরে যান। ব্যাট নামিয়ে রাখেন, যেন তলোয়ার সংবরণ করছেন। কি অবলীলায়, কি রাজসিকভাবে! তবুও মুছে যায় না তাঁদের রাজপাট। সেটা লেখা থাকে ইতিহাসের পাতায়, সোনার হরফে। চাইলেও তাঁকে ভোলা যাবে না।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link