পাকিস্তান ক্রিকেটের উথালপাথাল সমুদ্রে মোহাম্মদ হাফিজ ছিলেন এমন এক স্থির বাতিঘর, যিনি ঝড়ের রাতেও ড্রেসিংরুমকে দিশা দেখাতেন। মাঠে তাঁর শান্ত উপস্থিতি, তীক্ষ্ণ ক্রিকেটীয় মগজ আর সংকটকালে ব্যাট-বলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতার কারণেই সতীর্থরা ভালোবেসে তাঁর নাম দিয়েছিল ‘প্রফেসর’।
২০০০-এর দশকের শুরুতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ। প্রথম দিকে স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ২০১০ পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হাফিজ হয়ে ওঠেন অনন্য। শাদাব খান ও বাবর আজমদের যুগেও নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর ক্রিকেটীয় ট্যালেন্ট।
তাঁর পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে যেমন ছিল অর্জনের আলোকচ্ছটা, তেমনি ছিল বিতর্কের কালো ছায়াও। কয়েকবার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। যেকোনো বোলারের জন্য বারবার অ্যাকশন শুধরে ফিরে আসা মানসিকভাবে চরম পরীক্ষার। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন, বোলিং অ্যাকশন বৈধ করে দলে নিজের অলরাউন্ডার সত্তাকে টিকিয়ে রেখেছেন।

২০১৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় ছিল হাফিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্বর্ণালী মুহূর্ত। ভারতের বিরুদ্ধে ফাইনালে তার দায়িত্বশীল ও ঝড়ো ৩৭ বলে ৫৭ রানের অপরাজিত ইনিংসটি পিসিবি ও সমর্থকদের দীর্ঘদিনের আস্থার প্রতিদান দিয়েছিল। আবার ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অফ স্পিন ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং দিয়ে দলকে সেমিফাইনালে তোলার কারিগরও ছিলেন ৪০ পেরিয়ে যাওয়া এই অভিজ্ঞ তারকা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর পর তিনি কেবল প্যাড-গ্লাভস তুলে রাখেননি। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) ডিরেক্টর অব ক্রিকেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
পাকিস্তান ক্রিকেটের অস্থির হাওয়া, ঘনঘন অধিনায়ক বদল এবং অনিশ্চয়তার ভিড়ে মোহাম্মদ হাফিজ ছিলেন এক ধ্রুবতারা। নিজের প্রজ্ঞা, শৃঙ্খলা এবং ক্রিকেটের প্রতি একাগ্রতা দিয়ে তিনি যা রেখে গেছেন, তা কেবল সংখ্যা দিয়ে মাপা অসম্ভব। হাফিজের গল্পটা স্রেফ রান আর উইকেটের হিসাব নয়। এটি প্রতিকূলতাকে জয় করে দীর্ঘকাল শীর্ষে টিকে থাকার এক ক্রিকেটীয় মহাকাব্য।












