দিল স্কুপের জন্যই কি তিলকরত্নে দিলশান বিখ্যাত? আলোচনার টেবিলে বসে তাঁকে নিয়ে এর বাইরে বলার মতো কিছুই কি নেই? এই ধারণা নিয়ে বসে থাকলে দিলশানের বদলে যাওয়া চরিত্রকে একটু খাটো করেই দেখা হয়। ফিনিশার থেকে কিংবদন্তি ওপেনার হয়ে ওঠার যাত্রাটা সবার অলক্ষ্যে চলে যায়। তিনি যে প্রস্থানের আগে নিজের নামটা ক্রিকেটের ফলকে খোদাই করে রাখতে চেয়েছিলেন। সেটা তিনি পেরেছেন, দিল স্কুপের আবিষ্কার ছাড়াই দিলশানের চরিত্রটাই মনে রাখার মতো গল্প বলে যায়।
পরিসংখ্যান দিয়ে দিলশানকে মাপাটা বোকামি। অপারগতা নিয়েও আগ্রাসনের এই অগ্রদূত দেখিয়েছেন চাইলেই সব হয়, সব সম্ভব। ১৯৯৯ সালে অভিষেক হলেও প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পান ২০০৬ সালে। সাত বছরের এই অপেক্ষা তাঁকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে হয়তো। সাদামাটা একজন হয়েই শেষ হবে কি তাঁর পথচলা? ২০০৯ সাল পর্যন্ত ওই গল্পটা একই থাকে। দিলশান বিশেষ কেউ নন, গড়পড়তা ছাঁচে আটকে আছেন তখনও।
মাঝে মাঝে একটা সিদ্ধান্তই বদলে দেয় গোটা জীবনের গতিপথ। দিলশানের ক্ষেত্রেও তেমনই এক মোড় হয়ে এল ওপেনিংয়ে ব্যাট করার সুযোগ। শ্রীলঙ্কার টিম ম্যানেজমেন্ট বুঝতে পারল, ব্যাটিংয়ের শুরুতে নামলে এই মানুষটাকে অন্যভাবে পাওয়া সম্ভব। নতুন বল, ফাঁকা মাঠ, পাওয়ার প্লের সুযোগ; দিলশানের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের জন্য যেন এটাই ছিল উপযুক্ত মঞ্চ। ব্যস, বদলে গেল হিসাব। এরপর তিনিই হয়ে উঠলেন বোলারদের দুঃস্বপ্ন।
২০০৯ সালে ১১টি আন্তর্জাতিক শতক হাঁকিয়েছিলেন দিলশান। সংখ্যাটা আরেকবার পড়ুন, ১১টি শতক! যেন এত দিনের জমে থাকা আক্ষেপ এক বছরেই উগরে দিলেন ব্যাট হাতে। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাঁর আগ্রাসন হয়ে উঠল প্রতিপক্ষের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। এক পঞ্জিকাবর্ষে হাজার রান করেছেন চারবার। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতিটি বছরেই ওয়ানডেতে অন্তত ৮০০ রান করেছেন। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে পৌঁছেছেন ১০ হাজার রানের মাইলফলকে। অথচ এই মানুষটিই একটা সময় ছয় নম্বরে ব্যাট করে কাটিয়েছেন ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

এখানেই দিলশানের গল্পটা অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি শুধু রান করতে শেখেননি, শিখেছিলেন নিজের জন্য সঠিক জায়গাটা খুঁজে নিতে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ছয় নম্বরে ব্যাট করার সময় ওয়ানডেতে তাঁর গড় ছিল প্রায় ২৮। আর ওপেনিংয়ে উঠে সেই গড়ই পৌঁছে যায় ৪৫-এর ওপরে। ওয়ানডেতে ওপেনার হিসেবে করেছেন সাত হাজারেরও বেশি রান। পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান দিলশানকে নতুন করে আবিষ্কারের দলিল।
তবে ওপেনিংয়ে উঠে রান করার গল্পটাই দিলশানের শ্রেষ্ঠত্বের পুরোটা নয়। তিনি এমন এক ব্যাটার, যাঁকে আউট করাটাই বোলারদের জন্য কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতো। ক্রিজে যতক্ষণ থাকতেন, প্রতিপক্ষকে শাসন করাটাই যেন তাঁর ধর্ম। কখনো কাট, কখনো ড্রাইভ, কখনো মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণের দিক বদলে দেওয়া। ব্যাটিংয়ে ছিল আগ্রাসনের সঙ্গে নিজস্ব ছন্দের মিশেল।
কিন্তু শরীরে বুনো শক্তির আধিক্য ছিল না। লং অন কিংবা লং অফের ওপর দিয়ে কেবল পেশিশক্তির জোরে বল সীমানার বাইরে পাঠানোটা তাঁর জন্য খুব কঠিন ব্যাপার। দুর্বলতা বলতে ওই এক জায়গাতেই যেন ফাঁক রয়ে গিয়েছিল। আর ক্রিকেটের মজাটা হলো, নিজের সীমাবদ্ধতাই মানুষকে আবিষ্কারের পথে ঠেলে দেয়।
দিলশানও সেই পথেই হাঁটলেন। যে বলকে লং অন কিংবা লং অফের ওপর দিয়ে উড়িয়ে পাঠাতে বেগ পেতে হতো, সেই বলের জন্যই খুঁজে নিলেন অন্য রাস্তা। বেছে নিলেন উইকেটকিপারের মাথার ওপরের ফাঁকা জায়গাটুকু। আর সেখান থেকেই জন্ম নিল ক্রিকেটের অন্যতম অভিনব শট, ‘দিল স্কুপ’।
বোলার বুঝে গেছেন দিলশানকে সহজে ছাড় দেওয়া যাবে না। তাঁর কাট দুর্দান্ত, সাইডে খেলা শটগুলোও দারুণ কার্যকর। তাই তাঁকে আটকে রাখতে বল ফেলতে হবে পায়ের কাছে, করতে হবে ইয়র্কার কিংবা ফুলার লেন্থে আক্রমণ। অথচ সেই কৌশলই একসময় বুমেরাং হয়ে ফিরে আসত বোলারের দিকে।

দিলশান সামান্য ঝুঁকে ব্যাট চালাতেন, আর বল উড়ে যেত উইকেটকিপারের মাথার ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে। বোলার বুঝে উঠতে পারতেন না, কোন অস্ত্রে আটকাবেন এই মানুষটাকে। যে বল দিয়ে তাঁকে বেঁধে ফেলার কথা, সেই বল দিয়েই তিনি খুলে দিতেন বোলারের সাজানো প্রতিরক্ষার দরজা। তাঁর স্কুপটা ছিল শেকল ছেড়ে বেরিয়ে আসার গল্প। বিখ্যাত শটটা তাই তার আবিষ্কারকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
এটা নিছক শৌখিন কোনো উদ্ভাবন ছিল না। ছিল নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার বুদ্ধিদীপ্ত উপায়। পেশিশক্তিতে সব বল মাঠের বাইরে পাঠাতে না পারলেও ক্রিকেটীয় বুদ্ধি দিয়ে কীভাবে বোলারকে পরাস্ত করতে হয়, দিলশান যেন সেটাই দেখিয়েছেন। নিজের অপারগতা ঢাকতে গিয়ে এমন এক শটের জন্ম দিলেন, যা পরে হয়ে উঠল তাঁর নামের সমার্থক। দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তরের এর চেয়ে সুন্দর উদাহরণ আর কী হতে পারে!
ফিল্ডিংয়েও তাঁর অবদান কম নয়। বিশেষ করে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে তাঁর ক্ষিপ্রতা, বলের গতিপথ বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা আর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে আলাদা জায়গা করে দিয়েছিল। ব্যাট হাতে রান, বল হাতে উইকেট, মাঠে ক্ষিপ্র ফিল্ডিং; ক্রিকেটের তিন বিভাগেই নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার তৃষ্ণা ছিল তাঁর।
তাই দিলশানকে কেবল একজন আক্রমণাত্মক ব্যাটার বললে তাঁর ক্রিকেটীয় সত্তার বড় একটা অংশ অদেখাই থেকে যায়। তিনি ছিলেন শ্রীলঙ্কার অন্যতম কার্যকর অলরাউন্ডার, এমন এক ক্রিকেটার, যাঁর মূল্য সব সময় শুধু ব্যাটিংয়ের সংখ্যায় মাপা সম্ভব নয়।











