শ্রীলঙ্কার নিজস্ব স্যার ডন ব্র্যাডম্যান কিংবা স্বামী কেন আসামী!

কলম্বোর পি সারা ওভাল স্টেডিয়ামের যারা কাজ করেন, তারা ব্র্যাডম্যানকে ঠিকঠাক না চিনলেও মাহাদেভান সাথাসিভামকে ঠিকই চিনেন। বলা হয়, টেস্ট না খেলার পরও নাকি এই ব্যাটারকে দিব্যি কোনো বিশ্ব একাদশে নামিয়ে দেওয়া যেত।

ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে তাঁর বিশাল একটা ছবি। কলম্বোর পি সারা ওভাল স্টেডিয়ামের যারা কাজ করেন, তারা ব্র্যাডম্যানকে ঠিকঠাক না চিনলেও মাহাদেভান সাথাসিভামকে ঠিকই চিনেন। বলা হয়, টেস্ট না খেলার পরও নাকি এই ব্যাটারকে দিব্যি কোনো বিশ্ব একাদশে নামিয়ে দেওয়া যেত।

লঙ্কান বিশেষ করে তামিলদের কাছে তিনি আক্ষরিক অর্থেই নিজস্ব স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। কারও কারও কাছে তিনি রহস্য, কারও কারও জন্য তিনি হত্যা মামলার আসামী। ক্রিকেটের ‍বুকে তিনি তিনটি ভিন্ন জাতীয় ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দেওয়া একমাত্র অধিনায়ক।

কলম্বো ক্রিকেটের ইতিহাস বলে, শ্রীলঙ্কা থেকে উঠে আসা অন্যতম সেরা ব্যাটার এই মাহাদেভান। সেন্ট জোসেফ থেকে ওয়েসলি কলেজ – যখন যেখানে পড়েছেন, ক্রিকেটে সেরা ছিলেন। দ্যুতি ছড়িয়েছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে।

স্যার গারফিল্ড সোবার্স বলেছিলেন মাহাদেভান ক্রিকেট দুনিয়ার সেরা ব্যাটারদের একজন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের গ্রেট ফ্র্যাঙ্ক ওরেলও নাকি মাহাদেভানের চেয়ে ভালো ব্যাটার কখনও নিজের চোখে দেখেননি।

স্যার গ্যারি সোবার্সের সাথে

গুলাম আহমেদ, ভারতের সাবেক কিংবদন্তি স্পিনার ও অধিনায়ক বলেছিলেন, স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, ডেনিস কম্পটন কিংবা কিথ মিলার নয়, তিনি সবচেয়ে বেশি ভুগেছিলেন মাহাদেভানের বিপক্ষে। চিপকের সেই ম্যাচে সাউদার্ন ইন্ডিয়ার বিপক্ষে খেলতে নেমেছিলেন সিলন ক্রিকেট অ্যাকাডেমির মাহাদেভান।

২৪৮ মিনিট ক্রিজে থেকে মাহাদেভান করেছিলেন ২১৫ রান। চিপকের স্লো-টার্নারেও ৩৪ ওভার হাত ঘুরিয়ে গুলাম আহমেদ দিয়েছিলেন ১০৫ রান, ছিলেন উইকেটশূন্য।

শ্রীলঙ্কার তখন টেস্ট স্ট্যাটাস ছিল না। তবে, দিব্যি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে গেছেন মাহাদেভান। অভিষেক ম্যাচে ১৬৯ মিনিট ক্রিজে থেকে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি করে ফেলেন। নামের পাশে যোগ হয় ১০১ রান!

পি সারা ওভালে, স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে টস করতে নামেন ১৯৪৮ সালে

লম্বা সময় সিলনের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৫০ সালে কমনওয়েলথ একাদশের বিপক্ষে খেলতে নেমে ৯৬ রানের ইনিংস খেলেন সাথাসিভাম। দল ইনিংস ও ৫১ রানের ব্যবধানে হারলেও কলম্বোর লোকাল বয় তখন টক অব দ্য টাউন।

তখনই তিনি ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের নজরে আসে। তিনি বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে ওকে বিশ্ব একাদশ দলে নিয়ে ফেলা যায়!’ তখন সোনালি সময় পেছনে ফেলে আসা সাথার বয়স ৩৪।

ইংল্যান্ডে সিরিজ খেলতে পথে ওই সময় প্রায়ই লঙ্কা সফরে আসত অস্ট্রেলিয়া। ১৯৪৮ সাল দলটার অধিনায়ক ছিলেন খোদ ব্র্যাডম্যান। কলম্বো ওভাল মানে আজকের পি সারা ওভালে তিনি টস করতে নামেন সাথাসিভামের সাথে। সেই টসের আইকনিক ছবিটা আজও শোভা পাচ্ছে পি সারা ওভালের ড্রেসিংরুমে।

১১ টি প্রথম শ্রেণির ছোট্ট ক্যারিয়ারে রান করেছেন প্রায় ৪২ গড়ে। তিনটি সেঞ্চুরি আর তিনটি হাফ সেঞ্চুরির ক্যারিয়ার। অথচ, তিনি কখনও টেস্টই খেলতে পারলেন না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার সুযোগও আসত কালেভদ্রে।

আদালত ছেড়ে বের হচ্ছেন ‘নির্দোষ’ সাথাসিভাম
আদালত ছেড়ে বের হচ্ছেন ‘নির্দোষ’ সাথাসিভাম

পি সারা ওভালের মত ঐতিহাসিক মাঠের পুরোটা জুড়েই যেন এই সাথাসিভামের ছবি। অথচ, ব্যক্তিগত জীবনটা তাঁর ধোঁয়াশায় ভরা। ছিলেন খেয়ালি প্রবৃত্তির মানুষ। পার্টি আর নাচ-গানেই ডুবে থাকতেন। ফলে, স্ত্রীর সাথে বনিবনা হত না।

স্ত্রী আনন্দন সাথাসিভাম ডিভোর্স ফাইল করেন। গোল বাঁধে যখন আনন্দনের মৃত দেহ পাওয়া যায়। অভিযোগ ওঠে, পাটাপুতা দিয়ে স্ত্রীকে আঘাত করেন সাথাসিভাম। মামলা হয়। জীবনে নেমে আসে অন্ধকার।

রিমান্ডে নেওয়ার পর সাথাসিভামকে জুডিশিয়াল কাস্টডিতে পাঠানো হল ৬২৫ দিনের জন্য। তবে, ভাগ্য সহায় ছিল। জেলে ৫৭ দিন কাটানোর পরই তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করে আদালত। সেই সময় সিলনের খুব আলোচিত হত্যা মামলা ছিল, খুব চর্চা হত।

পত্রিকার কাগজে রগরগে খবর ছাপা হত হরদম। যখন জেলে ছিলেন, তখন নাকি দলবলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিল। সেই দলে গ্যারি সোবার্স-ফ্র্যাঙ্ক ওরেলরা ছিলেন।

কিন্তু, ততক্ষণে যা বদনাম হওয়ার হয়েই গেছেন সাথাসিভাম। সিলন ক্রিকেটের যুবরাজ আর শ্রীলঙ্কায় টিকতে পারেননি। লঙ্কা ছাড়লেন, তবে ক্রিকেট ছাড়লেন না। ক্রিকেট খেললেন মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে।

সেসব দেশে জাতীয় দলেও নেতৃত্ব দিলেন। এর বাদে ইন্সুরেন্স এজেন্ট হয়ে কাজ করেছেন। লন্ডনে গিয়েছিলেন, ওই সময় বাসিল ডি অলিভেইরার সাথে ক্রিকেট খেলারও সুযোগ হয়েছিল। ইংল্যান্ডের পাবগুলোতেও কিছু আমুদে সময় কাটান।

১৯১৮ সালে জন্ম। শ্রীলঙ্কার নাম তখন সিলন। শেষ বয়সে আবারও কলম্বো ফিরে আসেন। ১৯৭৭ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তাঁর চলে যাওয়ার বছর পাঁচেক পর নিজেদের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট খেলতে নামে শ্রীলঙ্কা। ওই পি সারা ওভালের মাঠেই, যেটা ছিল সাথার ঘরের মাঠ।

কিন্তু, সেই দিনটা দেখার জন্য সাথাসিভাম আর ছিলেন না। তবে, পি সারা ওভালে আজও যখন তামিল ইউনিয়ন দলের কোনো ব্যাটার ঝলসে ওঠে তখন স্মৃতির পাতায় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে উঁকি দেন তিনি – মাহাদেভান সাথাসিভাম।

১৯৪৭ সালের সিলন দল, নিচের সারিতে বাঁ-দিক থেকে তৃতীয় স্থানে মাহাদেভান সাথাসিভাম

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link