মায়াবী মাহেলা বৃত্তান্ত

‘You often took it for granted that Mahela was going to get a hundred but I will remember him as one of the best captain I played against.’ - কথাটা আমার মনগড়া নয়, কথাটা বলেছিলেন স্বয়ং ভিভিএস লক্ষ্মণ। তাঁর মতো ফিল্ড প্লেসিং, গেসিং পাওয়ার, মুহুর্তের মধ্যে ব্যাটসম্যানের মন পড়ে ফেলা অধিনায়ক খুব কমই এসেছে।

হঠাৎ করে স্লো হয়ে যাওয়া একটা ডেলিভারি অলস ভঙ্গিমায় আলতো করে ব্যাটের ঠিক মাঝখান দিয়ে ছুঁইয়ে থার্ডম্যানের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেওয়া – ক্রিকেটীয় ভাষায় ‘লেট কাট’। আলসেমিটা ইচ্ছে করেই, যেন স্লো বলের সাথে একটা কলোম্বিয়ান উইলোর রোম্যান্টিক স্পর্শের প্রতীক্ষা। এমন লেট কাট আর দেখেছেন কি?

সনাথ জয়াসুরিয়ার তাণ্ডবনৃত্য, তিলকারত্নে দিলশানের দিল-স্কুপ কিংবা ‘দ্য মোস্ট প্রেশাস’ কুমার সাঙ্গাকারার দ্য মোস্ট পারফেক্ট কভার ড্রাইভের ঔজ্জ্বল্যে যেন হারিয়ে গেছে সেই লেট কাটগুলো। আসুন এই লেট কাটের মালিক মাহেলা জয়াবর্ধনের গল্প শোনাই।

অবশ্যই, ঔজ্জ্বল্য বলাটা ভুল হবে। লঙ্কানরা কবেই বা ঔজ্জ্বল্য পেয়েছেন। এইতো সেবার, মুত্তিয়া মুরালিধরণ তখন ৭০০ উইকেটের দোরগোড়ায়, গেলো অস্ট্রেলিয়ায়। পঁচা ডিম ছুঁড়ে মারা হলো তাকে। কোনো কভারেজই হলোনা। সত্যি এটা যদি ভারত কিংবা ইংল্যান্ড হতো। সে যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

সময়টা তখন ১৯৯৭ সম্ভবত। দলে সদ্য যোগ দেওয়া সেই তরুণ ব্যাটসম্যান মাহেলা নেমেছিলো কলম্বো প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে। একটু ব্যাকগ্রাউন্ডটা বলে রাখি। তার ভাই ধীশালই ছিল তার ক্রিকেটের অনুপ্রেরণা। কিছুদিন আগেই ক্যান্সার ছিনিয়ে নিয়েছে তাকে। এমতাবস্থায় সেই ব্যাটসম্যান খেলতে নেমেছিল। প্রতিপক্ষে ভারত।

সেই ম্যাচের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়েছিল সনাথ জয়াসুরিয়া আর রোশান মহানামা – ৫৭৬ রানের রেকর্ড জুটি গড়ে। শ্রীলঙ্কার এক ইনিংসে ৯৫২ রানের বিশ্বরেকর্ড হয়।এতোগুলো পাপড়ির মাঝে যেন নবপল্লবের মতো চাপা পড়ে গিয়েছিল সেই তরুণ ব্যাটসম্যানটির ৬৬।

কাট টু ২০০৬। প্রোটিয়া বাহিনীর উপড় রাউটিং উইলো চালিয়ে ন’বছর আগের সেই ৫৭৬ এর রেকর্ড ভেঙে সাঙ্গার সাথে সে গড়ল ৬২৪ এর পার্টনারশিপ, তার একারই ৩৭৪। ঠিক যে রেকর্ডটার জন্য নয় বছর আগে জয়সূরিয়া-মহানামা নামক দুই গোলাপের ভারে চাপা পড়েছিল এক নবপল্লব, নয় বছর পর ঠিক সেই রেকর্ডটাকেই যেন সেদিনের সেই নবপল্লব এক বটবৃক্ষ হয়ে পুনর্স্থাপন করে গোলাপের মতো ছড়িয়ে দিল সবুজ গালিচা থেকে প্যাভিলিয়ন। যখন কোনো ইতিহাসে আপনাকে ঠাঁই দেওয়া হয় না, তখন নিজের কালি দিয়েই সেই ইতিহাস নতুন করে লিখতে হয়।

২০০৩ বিশ্বকাপ। শ্রীলঙ্কার দুঃস্বপ্নের মতো পারফরম্যান্স। ১, ৫, ৯, ১, ০, ০, ৫ – না এটা কোনো ল্যান্ডলাইন নাম্বার নয়। সেই ব্যাটসম্যানটির সেই বিশ্বকাপের রান সংখ্যা। একটা মাঝারি উচ্চতার বেশ মোটা সোটা শরীর পাঁচের নীচে গড় নিয়ে বারবার মাথা ঝাঁকিয়ে ফিরছিল প্যাভিলিয়নে।

কাট টু ২০০৭ বিশ্বকাপ। ক্যারিবিয়ান স্রোতের উষ্ণতায় অনেক তারকার ভিড়। হেইডেন গিলি শচীন-সৌরভ-রাহুল কিংবা লারা-পন্টিং, ম্যাকগ্রা-বন্ড – এত তারকাময় বিশ্বকাপ শেষ কবে দেখেছি জানি না। অন্যতম কঠিন এবং প্রতিদ্বন্দিতামূলক বিশ্বকাপ। কিন্তু অনেক তারকাই সেবার তারা হতে পারলো না। আর সেই তারার আকাশে যেন ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলে উঠল ২০০৩ এর সেই পাঁচ গড়ের মালিক। ২০০৭ এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানদাতা। গড় ষাটেরও বেশী। ব্যাটের চার্জ ফুরিয়ে আসতে থাকলে রিচার্জ করে নিতে হয়।

সেই ২০০৭ এরই এক ঘটনা বলি। শ্রীলঙ্কা বনাম ইংল্যান্ড। শেষ বলে ইংল্যান্ডের চাই তিন রান। স্ট্রাইকে ইন ফর্ম বোপারা। বোলিং এ আধা-বিখ্যাত দিলহারা ফার্নান্দো। বোপারা অপেক্ষায় ছিলেন স্লোয়ারের, অপরদিকে ফার্নান্দের মাথাতেও ছিল স্লোয়ারের আঁকিবুকি। এমতাবস্থায় এগিয়ে এলো অধিনায়ক। ফার্নান্দোকে বলে দিল ফাস্ট বল দিতে।

অবশেষে, স্লোয়ারের অপেক্ষায় থাকা বোপারা আকস্মিক ফাস্ট বলটা সামলাতে পারেনি, ম্যাচ জিতেছিল শ্রীলঙ্কা।

‘You often took it for granted that Mahela was going to get a hundred but I will remember him as one of the best captain I played against.’ – কথাটা আমার মনগড়া নয়, কথাটা বলেছিলেন স্বয়ং ভিভিএস লক্ষ্মণ। তাঁর মতো ফিল্ড প্লেসিং, গেসিং পাওয়ার, মুহুর্তের মধ্যে ব্যাটসম্যানের মন পড়ে ফেলা অধিনায়ক খুব কমই এসেছে।

একবার সবার আড়ালেই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অধিনায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন মাহেলা, লঙ্কানরা আড়ালে থাকেন চিরকালই। ২০০৭-এর বিশ্বকাপের সেমিতে সেঞ্চুরি করে দলকে ফাইনালে তোলার রঙিন অধ্যায়টা সাদাকালো হয়ে গিয়েছিল অ্যাডাম গিলক্রিস্ট নামক এক হলদে বাজির বিস্ফোরণে। আবার ২০১১’র ফাইনালে সেঞ্চুরিটাও সাদাকালো হয়ে গিয়েছিল মহেন্দ্র আর গৌতম নামক দুই নীলরত্নের ঔজ্জ্বল্যে।

‘বারেবারেই তারা এসে যায়। আমার কষ্টের ফলানো সোনার ক্ষেতের সোনালী ধান কেটে নিয়ে চলে গেলো।তাদের রইল সোনা আর আমার রইল ক্ষেতের মাটি, যাই আবার বীজ বুনি।’ – মাহেলার ক্রিকেট জীবন ব্যাখ্যা করলে এর চেয়ে ভালো উপমা দেওয়া আর হয়তো সম্ভব নয়। চার চারবার বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছিলেন, একবারও জিততে পারেননি, এর মধ্যে একবার টুর্নামেন্টের আর একবার দেশের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক,আরেকবার ফাইনালে সেঞ্চুরি। কিন্তু সোনার দেখা নেই।

তাই সেই কৃষকের মতোই আবারো বীজ বোনেন সোনার আসায়, যদিও অবশেষে তা একবারই এসেছিল, ২০১৪ টি টোয়েন্টিতে, সাঙ্গাকারার হাত ধরে। কিন্তু সেবারেও ভারতের দুর্বলতা বুঝে স্লগ ওভারে ইন ফর্ম যুবরাজ সিংকে মারতে না দেওয়াটা মাহেলারই মস্তিষ্কপ্রসূত। গৌতম গম্ভীরের মায়াবি ইনিংস কিংবা মহেন্দ্র সিং ধোনির বৌদ্ধিক ফিনিশিংটার দিকে কোথাও যেন অনাবিল নির্বাক রেডিওটার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মাহেলার অপরাজিত ১০৩!

আর কেবলই আওরে যায় – ‘তখন আমায় নাই বা মনে রাখলে’। তারপর সেই ম্যাচটায়, আম্পায়ার এমারসন চাক ডাকল মুরালিকে, রান্তুঙ্গা দল নিয়ে বেরিয়ে গেলো, সেবারেও ইংরেজদের তিনশোর বেশি টার্গেট চেজের পাশে ঝলমল করছে মাহেলার ঝলমলে একটা সেঞ্চুরি। ক্রিকেট ইতিহাসে ‘Caught by Mahela, Bowled by Murli’ – এই ঘটনাটাই ঘটেছে ৭৭ বার!

ওয়ানডে সম্ভবত সর্বোচ্চ ক্যাচের মালিক মাহেলা। ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার যে টেস্টে এগারো হাজার রানের মালিক সত্ত্বেও গড় পঞ্চাশের নিচে। অবিশ্বাস্য? না মশাই, যুক্তি আছে। প্রথমে ওপেনার, তারপর ওয়ান ডাউন, পরে সেটাও ছাড়তে হলো। আবার তারপর চার নম্বরটাও ছাড়তে হলো, পুনরায় আবার কখনও তিন কি কখনও আবার ওপেনিং – এর পরেও গড় পঞ্চাশ রাখাটা বোধহয় একটু বেশিই চাওয়া।

এত ঘন পজিশন পাল্টানো মহেন্দ্র সিং ধোনি ছাড়া কাউকে দেখিনি। এমনকি দিলশানের শ্রীলঙ্কার জঘন্য অবস্থায় এগিয়ে এসেছিলেন এই মাহেলাই, অধিনায়কত্ব ছেড়েও অধিনায়ক হয়েছিলেন। আর তার কিছু বছর পরেই ঘন নীলের ওপর হলুদ সিংহকে নীয়ে উইলোকে আস্তে আস্তে দু বার ঝাঁকিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন সেই ৯৭’এর সেদিনকার গোলাপচাপা নবপল্লব, ফিরলেন দীর্ঘদশক ছায়ার মতো ঘিরে থাকা বটবৃক্ষ হয়ে। ইনিংসের প্যাভিলিয়ন নয়, ক্যারিয়ারের প্যাভিলিয়ন।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’র পাশাপাশি একজন মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ‘ক্রিয়েশন অফ অ্যাডাম’ ছিল, যেটা বিখ্যাতদের রাস্তায় থেকেও ‘নাম না জানা ফুলের’ চ্যাপ্টারে থেকে গেছে আজও। ঠিক যেমন চকমকে দিলস্কুপ কিংবা মোস্ট পারফেক্ট কভার ড্রাইভের রাস্তায় হঠাৎই প্রেমিকের মন থেকে নিখোঁজ সন্ন্যাসীর মতোই মুছে গেছে মাহেলার দ্য মোস্ট পারফেক্ট লেটকাটগুলো।

আজও ‘জয়া’ বললে প্রথম নামটা ‘জয়াসুরিয়া’ই আসে, অবশ্য আসারই কথা। কিন্তু এ গল্পের ‘জয়া’ সূর্যের গল্প নয়, সেই কৃষকের গল্প, যার সোনালী ফসল বারে বারে কেটে নেয় কেউ, বাকিদের থাকে সোনা, তাঁর থাকে ক্ষেতটুকু, অবশেষে সে আবার আশার বীজ বোনে।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...