নজফগড়ের নবাবের নামে কাঁপত পৃথিবী!

এমসিসি ক্রিকেট বুক যেখানে বলে ‘অফস্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দাও’ — শেবাগ সেখানে বলতেন, ‘এই বলটাকেই মারার জন্য এসেছে জীবন।’

নজফগড়ের নবাব—এই তকমা শুনলেই যেন কানজোড়ায় ভেসে আসে ক্রিকেট মাঠের বিধ্বংসী এক মানচিত্র। সেখানে লাইন, লেন্থ, সুইং বা স্পিন — সবই যেন ব্যাটের নিচে চাপ পড়ত।0 নাম—বীরেন্দ্র শেবাগ।

২০০৩ সালের দক্ষিণ আফ্রিকার মাটি। এক সন্ধ্যায় জোহানেসবার্গের হোটেলরুমে সৌরভ গাঙ্গুলীর গলায় যে আত্মবিশ্বাস, সেখানে ছিল আগুনে ছাইচাপা চমক। ‘দাঁড় করিয়ে হারাতাম’—এই এক বাক্যে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, তার দলের ব্যাটিংয়ে ছিল নিখাদ ধ্বংসযজ্ঞ। আর সেই দলের আগাগোড়া ব্যাটিং লাইনআপের কেন্দ্রে ছিলেন যে নামটা, তিনিই এই নজফগড়ের নবাব।

সে সময় যখন বিশ্বের বড় বড় ব্যাটসম্যানরা লাল বলের সামনে দাঁড়ালে নি:শ্বাস গুনতেন, শেবাগ তখন বল গুনতেন — কতটুকু সময় লাগবে সেটা বাউন্ডারির ওপারে পাঠাতে। এমসিসি ক্রিকেট বুক যেখানে বলে ‘অফস্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দাও’ — শেবাগ সেখানে বলতেন, ‘এই বলটাকেই মারার জন্য এসেছে জীবন।’

সেই সময় ভারতকে যদি কেউ একার হাতে সবচেয়ে বেশি টেস্ট জেতায়, তবে সেটা ওই শেবাগ।’ ভাবুন তো, এমন একজন ওপেনার যার স্ট্রাইকরেট ৮২-এর ওপরে। পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই। অফস্টাম্পের বাইরে ‘মৃত্যুকূপে’ ঢুকে ছয় মেরে ফেরা মানুষ তো এই ধরায় একজনই ছিলেন

শেবাগ শুধু একজন ব্যাটার ছিলেন না —তিনি ছিলেন এক ‘ক্রিকেট-অ্যানার্কি’। এই উপাথি ক্রিকেটবোধকে এলোমেলো করে দেয় কখনও, আবার সেটাকেই কখনওবা নতুন সংজ্ঞা দেয়।

মহেন্দ্র সিং ধোনি একবার বলেছিলেন, ‘প্রতিপক্ষ অধিনায়ক হলে শেবাগের বিপক্ষে ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে শর্ট বল দিতাম লেগসাইডে। না হলে থামত না এই লোক।’

যারা পরিসংখ্যান দিয়ে শেবাগকে পরিমাপ করা যায় না। ৩০০ রানের দোরগোড়ায় ছয় মারতে গিয়ে আউট হওয়া, তারপরও নির্লিপ্ত মুখে মাঠ ছাড়ার যে সাহস, সেটা পরিসংখ্যান জানে না। সেটা বোঝে কেবল ইতিহাস।

ভারতের সাবেক কোচ গ্যারি কার্স্টেন বলেছিলেন, ‘ভারতের সবচেয়ে ভয়ংকর ম্যাচ উইনার শেবাগ। ও যদি ১০ ওভার টিকে যায়, ৭০ ভাগ ম্যাচ ভারত জিতে যায়।’ কী ভয়ংকর সত্যি!

শেবাগ কখনও শচীন, দ্রাবিড়, লক্ষ্মণের মত চিরন্তন সৌন্দর্য হতে চাননি। তিনি হতে চেয়েছেন আগুনের ফুলকি। কখনো বিস্ফোরণ, কখনো পরম স্বাধীনতা। তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের সেই শক্তি, যিনি একাই প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলতেন। যিনি ছিল ক্রিকেট মাঠের নটরাজ, যার ব্যাট ছিল তাণ্ডবের এক রুদ্র মূর্তি।

রমিজ রাজার গলায় আজও সেই কথাটা ভাসে, ‘ভিভ যাওয়ার পর মনে হয়েছিল বিনোদনের সময় শেষ। এরপর এল শেবাগ!’ — এটাই শেবাগের স্বীকৃতি। নজফগড়ের সেই নবাব—জীবনের নামটা লিখেছিলেন বাউন্ডারির কালি দিয়ে, বাইশ গজে তাঁর নামের পাশে একটাই শব্দ লেখা যায় — সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞ।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link