ফুটবল মাঠে ফ্রি কিক যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। যখন কোনো জাদুকর বলের গায়ে আলতো স্পর্শে রক্ষণ দেয়াল টপকে জাল খুঁজে নেন, গ্যালারিতে তখন আছড়ে পড়ে মুগ্ধতার ঢেউ। সম্প্রতি নিউইয়র্কের ইয়াঙ্কি স্টেডিয়ামে ইন্টার মায়ামির জার্সিতে তেমনই এক জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিলেন লিওনেল মেসি। নিউইয়র্ক সিটির বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানের জয়ে মেসির সেই গোলটি কেবল দলকে জেতায়নি, বরং নতুন করে জাগিয়ে দিয়েছে এক চিরন্তন বিতর্ক। ফ্রি কিক থেকে গোলের আসল রাজা কে?
এই গোলকধাঁধা ভাঙতে দীর্ঘ গবেষণা চালিয়েছিল ফুটবলের নির্ভরযোগ্য সাময়িকী ‘এল গ্রাফিকো’। ১৯১৯ সাল থেকে ফুটবল ইতিহাসের সাক্ষী এই পত্রিকাটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ফ্রি কিক গোলদাতাদের এক নির্ভুল ও পরিমার্জিত তালিকা। তাদের দাবি, ইন্টারনেটে প্রচলিত অনেক সংখ্যাই আসলে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমটির তথ্যানুযায়ী, লিওনেল মেসির বর্তমান ফ্রি কিক গোলসংখ্যা ৭১। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের আদর্শ ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে (৬১ গোল) অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে, মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই তালিকায় শীর্ষ দশেও জায়গা পাননি। ৬৩টি গোল নিয়ে এই পর্তুগিজ মহাতারকার অবস্থান ১১তম।

ফ্রি কিক তালিকার উপরের দিকে তাকালে মনে হবে এটি যেন কোনো ব্রাজিলিয়ান জাদুকরদের মিলনমেলা। এল গ্রাফিকোর পুনর্গঠিত এই তালিকায় সবার ওপরে আসীন আছেন ব্রাজিলের সাবেক মিডফিল্ডার মার্সেলিনিও ক্যারিওকা। নিজ দেশের ক্লাব ছাড়াও ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন লিগ মাতিয়ে তিনি ফ্রি কিক থেকে মোট ৭৮টি গোল করেছেন।
তালিকার দ্বিতীয় স্থানটি যৌথভাবে দখল করে আছেন আরও দুই ব্রাজিলিয়ান – রবার্তো দিনামিতে ও জাইর রোসা পিন্টো, যাদের প্রত্যেকের গোলসংখ্যা ৭৪। আর ৭২টি গোল নিয়ে তৃতীয় স্থানে আছেন জুনিনহো পারনামবুকানো। অর্থাৎ, ইতিহাসের শীর্ষ পাঁচ ফ্রি কিক গোলদাতার চারজনই ব্রাজিলিয়ান, যাদের ঠিক পেছনেই ৭১ গোল নিয়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন লিওনেল মেসি।
মেসির পরেই আবার অবস্থান আরেক দুই ব্রাজিলিয়ানের। ৬৯টি ফ্রি কিক গোল নিয়ে তালিকার ছয় নম্বরে রয়েছেন মার্কোস আসুনকাও। তার থেকে এক গোল পিছিয়ে সাত পরের নামটি জিকোর।

কেবল ফরোয়ার্ডরাই নন, গোলরক্ষক হয়েও ৫৯টি ফ্রি কিক গোল করে বিস্ময় জাগিয়েছেন ব্রাজিলের রোজারিও চেনি। এ ছাড়া পিয়েরে ভন হইজডঙ্ক, সিনিসা মিহাইলোভিচ কিংবা হোর্তে আরাভেনার মতো ফ্রি কিক স্পেশালিস্টদের নামও উজ্জ্বল হয়ে আছে এই পরিসংখ্যানে।
মার্সেলিনিও ক্যারিওকা থেকে শুরু করে আজকের লিওনেল মেসি – প্রত্যেকই যেন এক একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী। তারা ঘাসের ওপর স্থির পড়ে থাকা একটা প্রাণহীন চামড়ার গোলককে বাতাসের বুকে এমনভাবে ভাসিয়ে দেন, যা বিজ্ঞানের সূত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খুঁজে নেয় জালের ঠিকানা। ফুটবল যতদিন থাকবে, মাঠের সেই নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে নেওয়া জাদুকরী শটগুলো ততদিনই আমাদের মনে করিয়ে দেবে যে, সবুজ গালিচায় খেলোয়াড়রা শুধু খেলেনই না, চিত্র অঙ্কন করতেও জানেন।











