বিশ্বকাপ ব্যর্থতা থেকে বোর্ডে ভাঙন

নিজের আর্থিক বিষয়ে ‘অপর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা’র কথা বলে নাজমুল ইসলামকে আবারও অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান করার পক্ষে জোর দেন বুলবুল। বোর্ডে নাটের গুরু কে তাহলে? সেটা বুঝতে বিরাট কোনো জ্ঞানী তাই এখন না হলেও চলছে।

নতুন বোর্ড গঠনের উচ্ছ্বাস কাটতে না কাটতেই অস্থিরতার গহ্বরে পড়ে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে লিটন দাসদের না দেখতে পাওয়ার ধাক্কা যখন দেশের ক্রিকেটকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, ঠিক তখনই বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে ভাঙনের শুরু। গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ইশতিয়াক সাদেকের পদত্যাগ যেন সেই ভাঙনের প্রথম প্রকাশ্য চিহ্ন।

আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন ‘ব্যক্তিগত কারণে’। কিন্তু ধানমন্ডি ক্লাবপাড়ার ভেতরের গল্পটা ভিন্ন। ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের না থাকা—এই ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে বোর্ডে বসে থাকা ইশতিয়াক সাদেকের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। ক্রিকেটের উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে বোর্ডে এসেছিলেন তিনি; অথচ সেই ক্রিকেটই যখন হুমকির মুখে, তখন সেখানে কাজ করার পরিবেশ নেই—এই উপলব্ধিই তাকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে।

বিষয়টি আরও বিব্রতকর এই কারণে যে, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের বোর্ডে সাবেক ক্রিকেটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। একাধিক সাবেক অধিনায়ক রয়েছেন পরিচালনা পর্ষদে। সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল নিজেও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। অথচ তাদের নেতৃত্বেই ইতিহাসে প্রথমবার কোনো টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নেই।

বিশ্বকাপ ইস্যুতে বোর্ডের ভেতরে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে গুঞ্জন চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। বিভিন্ন পক্ষের টানাপোড়েনে কাজের পরিবেশ ভেঙে পড়তে শুরু করে। এমনকি শোনা যায়, সভাপতি বুলবুল নিজেও একসময় ভিন্ন একটি পক্ষে অবস্থান নেন।

পরিচালকদের দ্বন্দ্ব এতটাই চরমে পৌঁছায় যে সভাপতির সামনেই বাগবিতণ্ডা হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়—আর সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন বুলবুল নিজেই। এর মধ্যেই এক পরিচালকের বিরুদ্ধে বিপিএলে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ ওঠে, শুরু হয় বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের তদন্ত—যা দেশের ক্রিকেটে প্রায় নজিরবিহীন ঘটনা।

এখানেই শেষ নয়। সাবেক অধিনায়ক থেকে শুরু করে বর্তমান জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তিকর ও নেতিবাচক মন্তব্য করেও স্বপদে বহাল থাকেন এক পরিচালক—এম নাজমুল ইসলাম। খেলোয়াড়দের জন্য যেখানে কঠোর কোড অব কন্ডাক্ট আছে, সেখানে পরিচালকদের জন্য কার্যকর কোনো শৃঙ্খলা কাঠামো নেই—এই বাস্তবতা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বর্তমান বোর্ড। বরং বিতর্কিত মন্তব্যের পর শাস্তির বদলে নাজমুল ইসলামকে গোপনে ফের আগের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হলো।

১৫ জানুয়ারি তাঁর শাস্তির দাবিতে বিপিএল বয়কটের ডাক দেয় ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। দীর্ঘ আলোচনার পর নাজমুলের সরাসরি ক্ষমা আর দায়িত্ব ছাড়ার আশ্বাসে একদিন পর মাঠে ফেরেন ক্রিকেটাররা। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো আগুন নিভেছে। কিন্তু বিপিএল শেষ হতেই বোঝা গেল—সবই ছিল সাময়িক ধোঁয়াশা। নাজমুল ইসলাম আবারও স্বপদে ফিরে এলেন।

মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন প্রথমে দাবি করেছিলেন, বিষয়টি বোর্ড সভার আলোচ্যসূচিতেই ছিল না। পরে অবশ্য স্বীকার করেন, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে নাজমুলের ব্যাখ্যায় শৃঙ্খলা কমিটি ‘সন্তুষ্ট’। পুরো ঘটনাপ্রবাহে গণমাধ্যম এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা যে ছিল, তা আর লুকোনো থাকেনি।

বিসিবি সূত্র জানায়, বোর্ড সভায় সবচেয়ে বড় চমকটা দেন খোদ সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বিতর্কিত পরিচালকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাজনিত অবস্থান নেওয়ার বদলে তিনি বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যান। নিজের আর্থিক বিষয়ে ‘অপর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা’র কথা বলে নাজমুল ইসলামকে আবারও অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান করার পক্ষে জোর দেন বুলবুল। বোর্ডে নাটের গুরু কে তাহলে? সেটা বুঝতে বিরাট কোনো জ্ঞানী তাই এখন না হলেও চলছে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link