বাইশ গজে কিংবা পড়ার টেবিলে

পৃথিবীজুড়ে লেখাপড়া ও খেলাধুলায় সমান পারদর্শিতা দেখানো খেলোয়াড়ের সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয়। লেখাপড়া ও খেলাধুলা সম্পর্কিত উপরের ভ্রান্ত ধারণাটাকে ভুল প্রমাণিত করা বা খেলাধুলার সাথে লেখাপড়ার যে কোনো বিরোধ নেই সে ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত করা ক্রিকেটারের সংখ্যাও অনেক।

খেলাধুলা করলে না কি লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটে। এরকম একটা বদ্ধমূল ধারণার চর্চা আমাদের সমাজে লক্ষ্য করা যায়৷ যে কারণে যাপিত জীবনে বাবা-মার কাছ থেকে এই সাধারণ কথাটি আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, ‘আগে লেখাপড়া, তার পর খেলাধুলা।’

যদিও পৃথিবীজুড়ে লেখাপড়া ও খেলাধুলায় সমান পারদর্শিতা দেখানো খেলোয়াড়ের সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয়। লেখাপড়া ও খেলাধুলা সম্পর্কিত উপরের ভ্রান্ত ধারণাটাকে ভুল প্রমাণিত করা বা খেলাধুলার সাথে লেখাপড়ার যে কোনো বিরোধ নেই সে ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত করা ক্রিকেটারের সংখ্যাও অনেক।

খেলাধুলা ও লেখাপড়া- এ দুটি ভিন্ন জগতকে সমন্বয় করে ইতোমধ্যে সফল হয়েছেন বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার। ক্লাসরুমের পড়াশোনায় এবং বাইশ গজের খেলায় সমানতালে মুন্সিয়ানা দেখানো এসব ক্রিকেটারদের নিয়েই সাজানো আজকের আয়োজন।

  • রবিচন্দ্রন অশ্বিন

ইতোমধ্যে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে একজন বিশ্বস্ত বোলার এবং টেস্টে একজন দুর্দান্ত অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন। মূলত আইপিএলের মাধ্যমে প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন তামিলনাড়ুর এই ক্রিকেটার৷

চেন্নাইয়ের শ্রী শিভাসুব্রাম্যানিয়া নাদার কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ইনফরমেশন টেকনোলোজিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার পূর্বে একটি আইটি সংস্থায় চাকরি করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।

  • জাভাগাল শ্রীনাথ

জাভাগাল শ্রীনাথ ভারত দলের একজন প্রাক্তন সদস্য। তিনি ভারতের সেরা ফাস্ট বোলারদের একজন এবং ওয়ানডেতে তিনশর বেশি উইকেট শিকারি একমাত্র ভারতীয় ফাস্ট বোলার।

১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তাঁর। কাকতালীয়ভাবে ২০০৩ সালে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটাও খেলেন তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

মহিশূরের শ্রী জয়াচামারাজেন্দ্র প্রকৌশল কলেজ থেকে ইন্সট্রুমেনটেশন টেকনোলোজিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন শ্রীনাথ। বর্তমানে তিনি ম্যাচ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

  • কুমার সাঙ্গাকারা

শ্রীলঙ্কার সবর্কালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচিত কুমার সাঙ্গাকারা৷ তবে খেলাধুলার চেয়ে পড়ালেখায় তিনি কোনো অংশে কম ছিলেন না৷ কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি৷ তাছাড়া স্কুলজীবনে সেরা অলরাউন্ড শিক্ষার্থীর খেতাবও ছিল তাঁর দখলে।

  • মাইক ব্রিয়ারলি

মাইক ব্রিয়ারলি ব্যাট-প্যাড তুলে রেখেছেন আরও চার দশক পূর্বে। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি ইংল্যান্ড, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডলসেক্সের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

ঐতিহ্যবাহী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাসিক্যাল অ্যান্ড মোরাল সাইন্সে স্নাতকোত্তর করেন তিনি। বর্তমানে সাইকোথেরাপিস্ট, সাইকোঅ্যানালিস্ট ও মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন ব্রিয়ারলি।

  • রাহুল দ্রাবিড়

বেঙ্গালুরুর সেন্ট জোসেফস কমার্স কলেজ থেকে কমার্স বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন দ্রাবিড়। সেন্ট জোসেফসে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে এমবিএ করার সময় প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক পান তিনি।

খেলোয়াড়ি জীবনে সেরা রক্ষণাত্মক ব্যাটিং দক্ষতার জন্য ‘দ্য ওয়াল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাবেক এই ভারতীয় অধিনায়ক। সেইসাথে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম নিখুঁত টেকনিকের ব্যাটসম্যান হিসেবেও সুপরিচিত তিনি।

  • মুশফিকুর রহিম

বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে পরিশ্রমী ও মনোযোগী ক্রিকেটারের নাম মুশফিকুর রহিম। ঐচ্ছিক অনুশীলনে সবার আগে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি অনৈচ্ছিক অনুশীলনের দিন কেউ না থাকলেও ঠিকই মাঠে হাজির হয়ে যান তিনি।

ক্রিকেটার মুশফিকের মতো ছাত্র মুশফিকও  ছিলেন সমান মনোযোগী। ২০০৫ সালে অভিষেক সিরিজের সময় বিকেএসপিতে উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত ছিলেন তিনি। খেলার জন্য পড়ালেখায় যেন পিছিয়ে না পড়েন সেজন্য ইংল্যান্ড সফরে কিটব্যাগের পাশাপাশি বইয়ের ব্যাগও কাঁধে চাপিয়ে বসেন মুশি। সফরে অন্যরা যখন অনুশীলন করে হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিতেন তখন তিনি ঠায় বই নিয়ে টেবিলে বসে যেতেন। এমনকি বাসে করে মাঠে যাবার সময় বা রাতে আড্ডার সময়ও ছিল তাঁর পড়ার ব্যস্ততা।

এভাবে লেখাপড়া ও খেলাধুলা একসাথে সফলভাবে চালিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি টপকে একসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসের ওপর স্নাতক ও স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। বর্তমানে এমফিল (মাস্টার অব ফিলোসোফি) কোর্স করা মুশফিকের ভবিষ্যৎ ভাবনায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটের ওপর পিএইচডি করা।

  • কেন উইলিয়ামসন

সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ডের অনেক সাফল্যের রূপকার তিনি। এইতো কিছুদিন আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রথমবারের মতো টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে তুলেছেন দলকে। তর্কাতীতভাবে তিনি একজন অসাধারণ অধিনায়ক এবং শীর্ষ মানের ব্যাটসম্যান।

অনেকেই হয়তো জানেন না যে ক্রিকেটের মতো পড়াশোনায়ও বেশ দুর্দান্ত ছিলেন উইলিয়ামসন। যে কারণে একসময় হেড বয় হিসেবে স্কুলের প্রতিনিধিত্বও করেছেন তিনি।

  • ইমরান খান (পাকিস্তান)

তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দেশটির ইতিহাসে তো বটেই, ক্রিকেটের ইতিহাসেরও অন্যতম সেরা অধিনায়ক। তার মত অলরাউন্ডার ক্রিকেটে এসেছে হাতে গোনা কয়েকজন।

তাঁর পরিবার কখনোই লেখা পড়ার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়নি। লাহোরের ক্যাথেড্রাল স্কুল আইচিসন কলেজে পড়েছেন তিনি। সেখান থেকে ইংল্যান্ডের উস্টারে রয়্যাল গ্রামার স্কুলে যান। সেখানেই ক্রিকেট তাঁর বিকাশ হয়। এরপর তাঁর ঠাঁই হয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন।

  • রুডি ফন ভুরেন

২০০৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে নামিবিয়ার হয়ে খেলেন রুডি ফন ভুরেন। ক্রিকেটের পাশাপাশি রাগবিতেও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠ মাতিয়েছেন তিনি। খেলাধুলা ছেড়ে এখন নামিবিয়ার রাষ্ট্রপতি হেগ গেইনগবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন  এই সাবেক পেসার।

  • শিখা পান্ডে

ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলের এই পেসারের নামের পাশে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। তাছাড়া স্কুল-কলেজে পড়াকালীন তিনি অনবদ্য রেকর্ড গড়েন।

সেসময় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ৯০ শতাংশের উপরে নম্বর তোলার রেকর্ডটি ছিল তাঁর দখলে। এটাই প্রমাণ করে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে শিখা পান্ডে কতটা ভালো ছিলেন।

  • হ্যামিলটন মাসাকাদজা

জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান এই খেলোয়াড় একসময় টেস্টে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের রেকর্ডটির মালিক ছিলেন। ২০০১ সালে হারারেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শতক হাকিয়ে তিনি এ রেকর্ডের মালিক বনে যান। তখন গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিকদের মতো তারকা খেলোয়াড়দের ভিড়ে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়াটাই ছিল খুব কঠিন কাজ। কিন্তু ওই শতকের ফলে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই দলে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে ফেলেন তিনি।

ব্যক্তিগতভাবে লেখাপড়াটাকে খুব বেশি প্রাধান্য দিতেন মাসাকাদজা। যে কারণে ক্রিকেট থেকে বিরতি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অব ফ্রি স্টেটে পড়তে যান তিনি। তার পর লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে পুনরায় ফেরেন জাতীয় দলে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ ১৮ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ইতি টানেন মাসাকাদজা।

  • সাঈদ আনোয়ার (পাকিস্তান)

পাকিস্তানের ইতিহাসের সেরা ওপেনার এই ব্যাটসম্যান দেশটির হয়ে ওয়ানডেতে ৮৮২৪ রান করেছেন ৩৯.২২ গড়ে।দেশের হয়ে ফরম্যাটটির তৃতীয় সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকও তিনি। একটা সময় পাল্লা দিয়ে শচীন টেন্ডুলকারের সাথে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেছেন।

তবে এতোসব কীর্তি গড়ার আগে পড়াশোনার পাটটাও চুকিয়েছেন ভালো ভাবেই। করাচির এনইডি ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন তিনি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...