ঢাকায় ক্রিকেট এলো

দু’টো দল করা হল। ইংরেজ সিভিল অফিসাররা ছিলেন এক দলে; নাম ছিল ঢাকা স্টেশন। আরেকটায় খেললো ইংরেজ সৈনিকরা; নামটা ছিল বেশ রাজসিক – হার ম্যাজেস্টি’স ফিফটি ফোর্থ রেজিমেন্ট। ২০ জানুয়ারি, বুধবার মাঠে গড়ালো ‘ঐতিহাসিক’ সেই খেলা। এটাই ছিল ঢাকার ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ! ম্যাচটা কোথাও হয়েছিল সেটা এখন অবধি জানা যায়নি।

বলছি সেই ব্রিটিশ আমলের কথা। তখন সাল ১৮৫৮!

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ৫৪ তম রেজিমেন্ট তখন ঢাকার দায়িত্বে। স্থানীয় প্রতাপ থাকলেও বিনোদনের বড় অভাব ভিনদেশিদের। ঠিক হল, আয়োজিত হবে একটা ক্রিকেট ম্যাচ। তো, যেই কথা সেই কাজ।

দু’টো দল করা হল। ইংরেজ সিভিল অফিসাররা ছিলেন এক দলে; নাম ছিল ঢাকা স্টেশন। আরেকটায় খেললো ইংরেজ সৈনিকরা; নামটা ছিল বেশ রাজসিক – হার ম্যাজেস্টি’স ফিফটি ফোর্থ রেজিমেন্ট। ২০ জানুয়ারি, বুধবার মাঠে গড়ালো ‘ঐতিহাসিক’ সেই খেলা।

১৯৮৩ সালের ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের একটি ক্রিকেট ম্যাচটি। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় কোটাটে, জায়গাটা এখন পাকিস্তানের অংশ।

এটাই ছিল ঢাকার ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ! ম্যাচটা কোথাও হয়েছিল সেটা এখন অবধি জানা যায়নি।

১৯৮৩ সালের ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের একটি ক্রিকেট ম্যাচটি। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় কোটাটে, জায়গাটা এখন পাকিস্তানের অংশ।

১৯ শতক থেকেই বঙ্গভূমিতে বিদেশি দলগুলো আশা শুরু করে। তখন ক্রিকেটের কেন্দ্র ছিল কলকাতা কেন্দ্রিক। ইডেন গার্ডেন ছিল এই অঞ্চলের ক্রিকেটের স্বর্গদুয়ার। ফলে অধিকাংশ ক্রিকেটারই ছিলেন ওই অঞ্চলের। ভারতবর্ষ মানে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ প্রথম টেস্ট খেলে ১৯৩২ সালে। অবাঙালিদের আধিপত্যের মধ্যেও কিছু বাঙালিও টেস্ট খেলেছিলেন।

নিজের অভিষেক ম্যাচে এম এ চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে বাবা (বাঁয়ে) পঙ্কজ রায়ের সাথে প্রণব রায়।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নি:সন্দেহে পঙ্কজ রায়। এই বাঙালি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় দলের অধিনায়ক। ৪৩ টি টেস্ট খেলে করেছিলেন পাঁচটি সেঞ্চুরি ও নয়টি হাফ সেঞ্চুরি। তাঁর জন্ম কলকাতাতে হলেও আদতে তিনি বাংলাদেশের বিক্রমপুরের ছেলে।

তাঁর ভাই নিমাইলাল রায়ও ক্রিকেটার ছিলেন, যদিও কখনোই প্রথম শ্রেণির গণ্ডী পেরোতে পারেননি। পঙ্কজের ছেলে প্রণব রায় ও ভাইপো আম্বার রায়ও কালক্রমে ভারতের হয়ে টেস্ট করেছেন। তবে, কেউই পূর্বপুরুষের কীর্তি ছুঁতে পারেননি।

যাক, আবার ঢাকার ক্রিকেটে ফিরি। ব্রিটিশ আমলে কলকাতার আধিপত্যের কারণে ঢাকা একটু পিছিয়ে ছিল। তবে, এখনকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, মানে তখনকার ঢাকা স্টেডিয়ামের প্রথম ম্যাচ হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমলেই। ম্যাচটায় মুখোমুখি হয় বেঙ্গল গভর্নর একাদশ ও বেঙ্গল জিমখানা। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে হয়েছিল সেই ম্যাচ। গভর্নর তখন ছিলেন স্যার জন আর্থার হারবার্ট। এই ব্যক্তিকে অবশ্য ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার কলিন ম্যাকডোনাল্ডের বিপক্ষে বল করছেন ফজল মাহমুদ। ১৯৫৯ সালের ১৪ নভেম্বর ঢাকা স্টেডিয়াম (এখনকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) থেকে তোলা ছবি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও ঢাকা স্টেডিয়ামে রীতিমত টেস্ট ম্যাচ আয়োজিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৭১ সাল অবধি ঢাকা ছিল পাকিস্তানের হোম ভেন্যু। টেস্ট অভিষেক হয় ১৯৫৪ সালে। সেবার প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। কাকতালীয় ব্যাপার হল, ২০০০ সালে যখন টেস্টে বাংলাদেশের হোম ভেন্যু হিসেবে অভিষেক হয় ঢাকার, তখনও প্রতিপক্ষ ছিল ভারত।

বাংলাদেশের অভিষেকের আগে এই মাঠে আটটি টেস্ট অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সাতটিতেই পাকিস্তান খেলে স্বাগতিক দেশ হিসেবে। আর অষ্টমটিতে পাকিস্তান খেললেও সেবার মাঠটি ছিল স্রেফ নিরপেক্ষ ভেন্যু। ১৯৯৯ সালের সেই ম্যাচটা ছিল এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। পাকিস্তান ফাইনালে ইনিংস ও ১৭৪ রানের ব্যবধানে হারায় শ্রীলঙ্কাকে। ইজাজ আহমেদ ও ইনজামাম উল হকের ডাবল সেঞ্চুরি ও সাকলায়েন মুশতাকের ১০ উইকেট পাওয়ার ম্যাচ ছিল সেটা।

১৯৭৬-৭৭ মৌসুমে এমসিসির বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে নামার আগে বাংলাদেশ দল। সেবারই প্রথমবারের মত বিদেশি কোনো দলের বিপক্ষে দেশের মাটিতে মাঠে নামেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে নবগঠিত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল তাদের প্রথম ‘আন-অফিশিয়াল টেস্ট’ খেলেছিলো এই ঢাকা স্টেডিয়ামে। ‘আন-অফিসিয়াল টেস্ট’ বলার কারণ, ম্যাচটি ছিল লঙ্গার ভার্সনের। প্রতিপক্ষ দল ছিল মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) নির্বাচিত একাদশ। বাংলাদেশ সেবারই প্রথমবারের মত কোনো বিদেশি দলের বিপক্ষে খেলে।

প্রথম আন্তর্জাতিক জাতীয় ক্রিকেট দল বাংলাদেশে আসে এরপরের বছর মানে ১৯৭৮ সালে। দলটি ছিল শ্রীলঙ্কা। এই সফরের একাধিক একদিনের ম্যাচ, দুই দিনের ম্যাচ ও তিন দিনের আন অফিশিয়াল টেস্ট ম্যাচের ভেন্যু ছিল ঢাকা স্টেডিয়াম।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, তখনও মাঠটা ক্রিকেটের হাতেই ছিল।

বাংলাদেশ এই ভেন্যুতে সর্বশেষ সত্যিকারের টেস্ট খেলে ২০০৫ সালে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই ম্যাচটা ড্র হয় নাফিস ইকবালের নায়কোচিত এক সেঞ্চুরিতে। বাংলাদেশ নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মত কোনো টেস্ট সিরিজ জিতে নেয়। সেই ঐতিহাসিক দিনে আরেকটি ইতিহাস রচিত হয়, সেদিনের পর যে মাঠটিতে আর কখনোই টেস্ট খেলা হয়নি!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...