২০০২ সালের ১৯ অক্টোবর। গুডিসন পার্কের গ্যালারিতে বিষণ্ণতার ছায়া, প্রতিপক্ষ আর্সেনাল টানা ৩০ ম্যাচ ধরে অপরাজিত। ম্যাচের ঠিক ৮৯তম মিনিটে ১৬ বছর বয়সের এক বালক বক্সের বেশ কিছুটা বাইরে বল পেল। একটু জায়গা বানিয়েই ডান পায়ের এক বাঁকানো ভলিতে পরাস্ত করলেন ডেভিড সিম্যানকে। ধারাভাষ্যকার ক্লাইভ টাইলেসলি তখন চিৎকার করে উঠেছিলেন ‘রিমেম্বার দ্য নেইম, ওয়েন রুনি!’ সেদিন ফুটবল বিশ্ব কেবল একটি গোল দেখেনি, দেখেছিল এক অদম্য আগ্নেয়গিরির আত্মপ্রকাশ।
লিভারপুলের ক্রক্সটেথের ইট-পাথরের রাজপথে বেড়ে ওঠা রুনির ফুটবল শিক্ষা কোনো ঝলমলে অ্যাকাডেমিতে হয়নি। মাঠে-ঘাটেই গড়ে উঠেছিল তাঁর খেলার ভেতরের ‘স্ট্রিট ফাইটার’ স্বভাব। ২০০৪ ইউরোতে ইংল্যান্ডের জার্সিতে ঝোড়ো পারফরম্যান্সের পর স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন এক মুহূর্ত দেরি না করে রেকর্ড ফি দিয়ে তাকে নিয়ে আসেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। আর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে অভিষেক ম্যাচেই ফেনারবাচের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে রুনি জানান দেন, তিনি ইতিহাস লিখতে এসেছেন।
রুনির ক্যারিয়ার ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ২০০৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ার পর তাঁর ক্লাব সতীর্থ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সেই বিতর্কিত চোখ কাণ্ড নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল ফুটবল বিশ্ব। অনেকেই ভেবেছিলেন ইউনাইটেডে তাদের জুটি শেষ। কিন্তু রুনি ব্যক্তিপ্রেমের চেয়ে ফুটবলকে বড় করে দেখে রোনালদোর সাথে হাত মেলান এবং পরদিনই দলকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি উপহার দেন।

২০১১ সালের ডার্বি ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে রুনির সেই শূন্যে ভেসে করা বাইসাইকেল কিক আজও ফুটবলের অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম হিসেবে গণ্য হয়। ম্যাচ শেষে দু হাত ছড়িয়ে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের গ্যালারির দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য ফুটবলের চিরন্তন এক পোস্টার হয়ে রয়েছে।
রুনির ফুটবলের আসল সৌন্দর্য ছিল তাঁর বহুমুখীতায়। তিনি ছিলেন কখনো স্ট্রাইকার, কখনো দশ নম্বর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, আবার কখনো দলের প্রয়োজনে নিখুঁত উইঙ্গার বা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি পাঁচ বার প্রিমিয়ার লিগ এবং এক বার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে ২৫৩ গোল করে ছাড়িয়ে গেছেন ক্লাবটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা স্যার ববি চার্লটনের রেকর্ড। পাশাপাশি ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সিতেও ৫৩ গোল করে দেশের ফুটবলে অমর হয়ে আছেন।
২০১৭ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড ছাড়ার সময় তিনি রেখে গেছেন এক সোনালী উত্তরাধিকার। একজন খেলোয়াড় যিনি দলের প্রয়োজনে নিজের ব্যক্তিগত রেকর্ডের মায়া ত্যাগ করে যেকোনো পজিশনে খেলে গেছেন। ওয়েন রুনি কেবল পরিসংখ্যানের কোনো নায়ক নন। তিনি ফুটবলের শেষ ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ যুগের এক কাঁচা আবেগ, যিনি প্রতিটি বলের পেছনে তাড়া করতেন যেন ওটাই তাঁর জীবনের শেষ সুযোগ।












