আফ্রিদি-ধোনিদের চা-বন্ধু

হঠাৎ চোখ গেলো অ্যাকাডেমি মাঠের এক কোনায়। একটা ছোটখাটো মানুষকে ঘিরে দাড়িয়েছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি, শহীদ খান আফ্রিদি, কুমার সাঙ্গাকারা আর মুশফিকুর রহিম। একটু পরেই তিন জনের হাতে ছলকে উঠলো তিনটে চায়ের কাপ। দূর থেকে শোনা গেলো আফ্রিদির কণ্ঠ, ‘বিনা শাক্কার কে হ্যায় তো?’

ধরে নেওয়া যাক, পৃথিবী এখন আর করোনার গ্রাসে বন্দী নেই।

রাস্তায় রাস্তায় মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দুশ্চিন্তাহীন সুখী মানুষের সারি এবং হাসপাতালে নেই হাহাকার। এমনই দারুন সকালে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের নানা প্রান্তে অনুশীলন করছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা দল।

সম্ভবত কোনো একটা বহুজাতিক টুর্নামেন্ট শুরু হবে দু-এক দিনে।

সাংবাদিকরা আগের মতোই বিনা বাঁধায় ইনডোর, অ্যাকাডেমি মাঠ কিংবা মূল মাঠের পাশে ইতস্তত ঘুরছেন। অ্যাকাডেমি মাঠের দুই প্রান্তে অনুশীলন করছে ভারত ও পাকিস্তান দল। জিমে জোর ঘাম ঝরিয়ে বের হয়েছেন মুশফিকুর রহিম।

হঠাৎ চোখ গেলো অ্যাকাডেমি মাঠের এক কোনায়। একটা ছোটখাটো মানুষকে ঘিরে দাড়িয়েছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি, শহীদ খান আফ্রিদি, কুমার সাঙ্গাকারা আর মুশফিকুর রহিম। একটু পরেই তিন জনের হাতে ছলকে উঠলো তিনটে চায়ের কাপ। দূর থেকে শোনা গেলো আফ্রিদির কণ্ঠ, ‘বিনা শক্কর কে হ্যায় তো?’

যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, তিনি কানে শুনতে পান না। তারপরও অভ্যস্থ কণ্ঠে প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘আচ্ছা হ্যায়, আচ্ছা চায়। খাও।’

শুনে লোকটাকে জড়িয়ে ধরলেন ধোনি। যেনো সাত জনমের বন্ধু।

হ্যা, তিনি ক্রিকেটারদের, ক্রিকেট সাংবাদিকদের, ক্রিকেট সংগঠকদের বন্ধু। চা-বন্ধু। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বুলু; বুলু ঘোষ।

ওপরের ঘটনাটা একটু কল্পনা করে তৈরী করে নেওয়া হলেও করোনার আগে এটা মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের নিয়মিত চিত্র ছিলো। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ কিংবা বিপিএল; মিরপুর স্টেডিয়ামে তারকাদের পায়ের ছোঁয়া পড়তেই শুরু হয়ে যায় বুলুর চা বানানোর সংগ্রাম।

আর তার হাতের এক কাপ চায়ের জন্য মুখিয়ে থাকেন ওয়াকার ইউনুস, মহেন্দ্র সিং ধোনি, কুমার সাঙ্গাকারা, শহীদ আফ্রিদি, আমাদের তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম থেকে শুরু করে কপিল দেব বা সুনীল গাভাস্কারও!

বিশ্বাস করেন, ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ‘সেলিব্রিটি চা-ওয়ালা’ নিশ্চয়ই আমাদের বুলু। বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতীক।

বুলুর শুরুটা সেলিব্রেটেড ছিলো না।

পুরোনো ঢাকার লালবাগে নিতান্ত নিম্নবিত্ত এক পরিবারে জন্ম বুলুর। বয়স বছর ছয়েক হতে না হতেই দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছন্নছাড়া হয়ে পড়া পরিবার। বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। আর কিছুদিন ঢাকায় পালিয়ে থাকার পর ছোট্ট বুলুকে নিয়ে বাবা-মা ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন।

দেশে ফেরার পর বুলুকে নিয়ে বাবা-মা পড়লেন বিপদে। এমনিতেই অভাবের সংসার। তারওপর বুলু আবার কানে প্রায় শুনতেই পায় না। এ অবস্থায় পড়লালেখা চালানোই কষ্ট। তারপরও খুব কষ্ট করে স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের কথা বোঝার প্রায় বৃথা চেষ্টা করে বুলু।

এর মধ্যে বুলুর চোখে নেশা ধরিয়ে দেয় ফুটবল। সেই পুরোনো ঢাকা থেকে রোজ পাড়ার ছেলেদের সাথে চলে আসে ঢাকা স্টেডিয়ামে (এখনকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম)। মুগ্ধ হয়ে দেখে সালাউদ্দিন, আসলামদের কারিকুরি। হ্যা, সালাউদ্দিনদের প্রতি প্রেমই তাকে টেনে আনে আবাহনী ক্লাবের মাঠে। একটা সময় বুলুকে দেখা যায়, বাড়ি-ঘর বাদ দিয়ে ক্লাবের মাঠে পড়ে থাকতে।

এর মধ্যেই দেশে ঘটে যায় বিরাট এক পট পরিবর্তন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ভয়ানক এক কালো রাতে সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির জনককে। এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হন আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের খেলাধুলার অন্যতম প্রাণপুরুষ শেখ কামালও। আর এই ঘটনাটা বুলুকে খুব ছুঁয়ে যায়।

তখনও নিতান্ত নাবালক বুলু ঠিক করে সে আবাহনী ক্লাবেই জীবন কাটিয়ে দেবে। তাই করে।

এর মধ্যে পুরোন ঢাকার এক সংগঠক তাকে কাজে লাগিয়ে দেন। ঢাকা স্টেডিয়ামের গেটে ডিউটি। লোকেদের টিকিট চেক করে ঢুকাতে হবে। এই কাজটা দারুন পছন্দ হয়ে যায় বুলুর। একই সাথে খেলা দেখাও হবে এবং কিছু টাকাও মিলতো। প্রতিদিন কাজের জন্য ৫৫ টাকা করে পেতো বুলু।

এভাবে গোটা দুয়েক দশক পার হয়ে যায়। নব্বইয়ের শুরুর দিকে বুলু ক্রিকেটেও কাজ পেতে শুরু করেন এক সংগঠকের সৌজন্যে। বিশেষ করে ভিআইপি গেটে ডিউটি করার কারণে অনেক বড় বড় মানুষের সাথে পরিচয় হয়। তাদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।

আস্তে আস্তে মিরপুরে চলে আসে ক্রিকেট। ক্রিকেটের সাথে বুলুও মিরপুরে চলে আসে। কখনো কখনো ফুটবলের ডিউটিও করে। এই দু জায়গায় দিন হিসেবের কাজ করে, যা মেলে, তাই দিয়ে চলে সংসার।

এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ জিতে যায় আইসিসি ট্রফি। উৎসবে ফেটে পড়ে দেশ। মানিক মিয়া এভিনিউ, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, আবাহনী ক্লাব; সবখানে উৎসব। আর এই সময়েই বুলুর দুরাবস্থা চিন্তা করে তখনকার বিসিবি সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী তাকে কানে শোনার একটা যন্ত্র কিনে দেন। বুলুর জীবনটা একটু বদলে যায়। এখন সে সকলের কথা একটু হলেও শুনতে পায়।

বুলু হয়ে ওঠে ক্রিকেট পরিবারের অতি আপন জন। ক্রিকেটাররা অনুশীলনে আসে। তাদের সাথে গল্প করে বুলু। ক্রিকেটাররা রিকশা থেকে নেমে আস্ত নোট দেয়; ভাঙতি টাকা বুলু পেয়ে যায়। এভাবে ক্রিকেটার আর ক্রিকেট বুলুকে টিকিয়ে রাখে।

২০১১ সালে একটা ঘটনা ঘটে। বিশ্বকাপ। এবার বুলুর ডিউটি পড়ে খেলোয়াড়দের অনুশীলনের পাশে।

সে আগে থেকে ভালো লেবু চা বানাতে পারতো। তাকে বলা হলো চা বানিয়ে সবাইকে খাওয়ানোর জন্য। এই শুরু চা-বন্ধু জীবনের। বুলুর চা মুহুর্তে মুগ্ধ করে ফেলে সাঙ্গাকারা, আফ্রিদি, ধোনি থেকে শুরু করে ধারাভাষ্য দিতে আসা কপিল দেব বা কোচ ওয়াকার ইউনুসকেও। এটা একটু একটু করে মিরপুর স্টেডিয়ামের একটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

সিরিজ হলেই বুলুর চা। দেশের ক্রিকেটাররাও মজে ওঠেন এই চায়ে, মুগ্ধ করে বুলু সাংবাদিকদেরও। বুলু বলে, ‘ধোনি ভাই তো আমার চা খুব পছন্দ করে। আর আফ্রিদি ভাই বলে, চিনি ছাড়া চা। কত কাপ যে খায়। সবাই খায়। সবাই খায়। সবাই ভালো বলে।’

বুলু তার জীবন নিয়ে খুব খুশী। বিবাহিত সংসারে দুই কন্যা আছে। এক কন্যাকে সে তার নেত্রীর কাছে নিতে পেরেছিলো; সেটা জীবনের বড় পাওয়া। আর ক্রিকেটে যেভাবে আছে, তাতে তার কোনো অভিযোগ নেই, ‘আমাকে সবাই ভালোবাসে। পাপন ভাই, সুজন ভাই (বিসিবি প্রধাণ নির্বাহী), মল্লিক ভাই (ইসমাইল হায়দার) ভালোবাসেন। আগে সাবের ভাইরাও আমারে অনেক দিছে। আর আকরাম ভাই, নান্নু ভাই থেকে তামিম ভাই, মাশরাফি ভাই, মুশফিক ভাই আমাকে অনেক হেল্প করে। সব ক্রিকেটারই ভালো।’

বুলুর এই সাজানো জীবনে অবশ্য একটু বাঁধা তৈরী করেছে করোনা। আর সবার মতো এই সময়ে কর্মহীন হয়ে আছে সে। এমনিতে কাজ করলে দিনে ৬-৭ শত টাকা পায়। কিন্তু এখন প্রায় বেকার। তবে বুলুর ধারণা, এই সময় দ্রুতই কেটে যাবে, ‘উপরওয়ালা চাইলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ক্রিকেট মাঠে ফিরতে পারলেই আমার শান্তি।’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...