পাকিস্তান ক্রিকেটের বলিউড তারকা

সেসময় ক্রিকেটারদের মধ্যে যথেষ্ট স্মার্ট আর সুদর্শন ছিলেন মহসিন। যার কারণে তাঁর সামনে সুযোগ আসে বলিউডের ছবিতে অভিনয় করার! আর এর কারণেই মহসিনের ক্রিকেট ক্যারিয়ার থমকে যায় মাত্র ৩১ বছর বয়সে। যে সময়টাই একজন ক্রিকেটার নিজের সেরা সময় পার করেন সে সময়ে মুভিতে কাজ করায় ব্যস্ত ছিলেন মহসিন! ক্রিকেট ছেড়ে মনোযোগী হন সিনেমাতে।

আশির দশকে তথা পাকিস্তান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওপেনার হিসেবে পরিচিত মহসিন খান। তার সময়ের সেরা একজন ড্যাশিং ওপেনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন মহসিন। সামনে-পেছনে দুই পায়েই সমানতালে শটস খেলতে পারতেন তিনি। সহজাত স্ট্রোকমেকিং ব্যাটিং ছিলো দেখার মতো। সারাদিন যেনো তিনি অনায়াসে বাউন্ডারি হাঁকাতে পারবেন! মহসিনের ব্যাটিং ছিলো অনেকটাই জনপ্রিয় গেইম ‘ফ্রুট নিঞ্জা’র মতো।

তবে শুধু এই ব্যাটিং দিয়ে মহসিন খানকে চেনা যাবে না। মহসিন খান ছিলেন এক দারুণ স্টাইলিশ ক্রিকেটার। ইমরান খানের আগে পাকিস্তানী ক্রিকেটের সবচেয়ে সুদর্শন তারকা। এই দর্শনের ব্যাপারটা বেশ কাজেও লাগিয়েছেন। নিজের দেশ থেকে শুরু করে বলিউডেও করেছেন অভিনয়।

১৯৭৮ সালে টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরু। প্রথম ৬ ইনিংসে ফিফটি না পেলেও রান করেছিলেন ইনিংস প্রতি ত্রিশের উপরে। অভিষেকের বছর চারেক বাদে ১৯৮২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দেখা পান টেস্ট সেঞ্চুরির। অবশ্য এর আগে ছিলেনে একেবারেই অনিয়মিত।

ক্যারিয়ারের প্রথম তিন বছরে খেলেছেন মোটে ৮ টেস্ট! আর সেখান থেকেই নিজেকে ওপেনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন মহসিন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্যারিয়ারের বাকি সময়টা পার করেছেন ওপেনার হিসেবেই। মুদাসসর নজরের সাথে জুটি বেঁধে খেলেছেন লম্বা সময়।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওই সেঞ্চুরির পরের সিরিজেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক লর্ডসে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পান মহসিন। প্রথম পাকিস্তানি ব্যাটার হিসেবে লর্ডসে সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েন এই ওপেনার। ওই বছর ছিলো মহসিনের ক্যারিয়ারের সেরা সময়। ১৯৮২ সালে ১০ টেস্টে ৪ সেঞ্চুরি আর ৪ ফিফটিতে ৭৪ গড়ে করেছিলেন ১০২৯ রান!

এশিয়ার হয়ে সেসময় খুব কম ব্যাটারই বাইরের কন্ডিশনে সাফল্য পেয়েছিলো। এর মধ্যে একজন ছিলেন মহসিন। ক্যারিয়ারের সাত সেঞ্চুরির তিনটি করেন সিমিং উইকেটে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে করেন দুই সেঞ্চুরি! অবশ্য ঘরের মাঠে লাহোরে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য! লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে করেন ক্যারিয়ারের চার টেস্ট সেঞ্চুরি!

সেসময় ক্রিকেটারদের মধ্যে যথেষ্ট স্মার্ট আর সুদর্শন ছিলেন মহসিন। যার কারণে তার সামনে সুযোগ আসে বলিউডের ছবিতে অভিনয় করার! আর এর কারণেই মহসিনের ক্রিকেট ক্যারিয়ার থমকে যায় মাত্র ৩১ বছর বয়সে। যে সময়টাই একজন ক্রিকেটার নিজের সেরা সময় পার করেন সে সময়ে মুভিতে কাজ করায় ব্যস্ত ছিলেন মহসিন! ক্রিকেট ছেড়ে মনোযোগী হন সিনেমাতে।

সেসময় বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন রিনা রয়। ক্যারিয়ারের শীর্ষ অবস্থানে থাকাকালীনই একাধিকবার বিতর্কে নাম জড়িয়েছে রিনার। একসময় বলিউড তারকা শত্রুঘন সিনহার সঙ্গেও রীনার প্রেম চর্চার কথা উঠে আসে। পরবর্তীতে মহসিন খানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে আর সেখান থেকেই বিয়ে!

আট বছরের ক্যারিয়ারে তেরোটি ছবি করলেও খুব বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি মহসিন। ১৯৮৯ সালে জেপি দত্ত’র ‘বাটওয়ারা’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। যে সিনেমায় তার সহশিল্পী ছিলেন ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না, ডিম্পল কাপাডিয়া, অমৃতা সিং, পুনম ধীলন, শাম্মি কাপুর, অমরিশ পুরি প্রমুখ। সেই ছবিতে সেরা সহ-অভিনেতা হিসেবে খ্যাতনামা ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও পান তিনি।

বড় সাফল্য আসে ১৯৯১ সালে। সেবার মহেশ ভাটের ব্যবসায়িক সফল ‘সাথি’ ছবিতে ছিলেন তিনি। আরো ছিলেন আদিত্য পাঞ্চোলি ও বর্ষা উসগাওকার। পরে নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানেও কিছু ছবি করেন মহসিন খান। ১৯৯১ সালে তাঁর আরে তিনটি ছবি মুক্তি পায় – ফাতেহ, গুনেহগার কউন ও প্রতিকার। সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ১৯৯৭ সালে সঞ্জয় দত্ত অভিনীত ছবি ‘মহন্ত’।

বেশিরভাগ ছবিই ছিলো ফ্লপ! বলিউড ক্যারিয়ারের সাথে সাথে তাঁর সাথে রিনা রয়ের সম্পর্কও টিকেনি।

১৯৮৪ সালের পরই টেস্ট ক্রিকেটে অধারাবাহিক হয়ে পড়েন মহসিন। পারফরম্যান্সটাও ঠিকঠাক হচ্ছিলো না। তবে রঙিন জার্সিতে ছিলেন নিয়মিত মুখ। রঙিন জার্সিতে যতদিনই খেলেছেন ছিলেন নিয়মিত এক মুখ। তবে সাদা পোশাকের মতো রঙিন জার্সিটা উজ্জ্বল করতে পারেননি এই ওপেনার। ৪৮ টেস্টে ৭ সেঞ্চুরি আর ৯ ফিফটিতে ৩৭ গড়ে ২৭০৯ রান করা মহসিন ওয়ানডেতে করেছেন ৭৫ ম্যাচে ২ সেঞ্চুরি আর ৮ ফিফটিতে ২৭ গড়ে ১৮৭৭ রান।

মহসিনের সামনে সুযোগ আর সম্ভাবনা দুটোই ছিলো ক্যারিয়ার দীর্ঘ করার। কিন্তু হেয়ালিপনা আর সিনেমা জগতে ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে ভাটা পড়ে তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ার। ৩১ বছর বয়সেই শেষ হয়ে যায় মহসিনের ক্রিকেট ক্যারিয়ার।

২০১০ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) প্রধান নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। সেখানেও জন্ম দেন বিতর্কের। খবর প্রকাশ হয় সিন্ধ প্রদেশের ক্রিকেটারদের দলে আনতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট লিগেও নিজ অঞ্চলের ক্রিকেটারদের সুযোগ দিচ্ছিলেন।

যদিও তিনি এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে বছর খানেকের মাথায় তাঁকে প্রধান কোচের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ওয়াকার ইউনিসের দায়িত্বে অন্ত্যবর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পান মহসিন। এরপর বেশ কয়েক দফা খণ্ডকালীন মেয়াদে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সাবেক এই পাকিস্তানি ওপেনার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...