আধুনিক ফুটবলে এখন টাকার ছড়াছড়ি। নিজের ক্যারিয়ারকে উঁচুতে নিতে, নিজেকে সেরাদের সেরা বানাতে বড় বড় ক্লাবে যোগ দেওয়াই বর্তমানের ফুটবলারদের এক নিশ্চল নিয়তি! অথচ, ইংলিশ ফুটবলে একদা এক তারকা উদিত হয়েছিল, যাঁর পদযাত্রা ছিল প্রথাগত আধুনিক সব খেলোয়াড়দের বিপরীত দিকে!
তিনি স্টিভেন জেরার্ড। ট্রফি আর টাকার জৌলুসকে পরোয়া না করে যিনি আজীবন লিভারপুলে খেলে গেছেন আজন্ম আনুগত্য ধরে রেখে! মার্সিসাইডের হুইস্টনে ১৯৮০ সালে জন্মানো জেরার্ড কেবল লিভারপুলের খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই ঐতিহাসিক শহরের হৃৎস্পন্দন ও গর্বের প্রতীক।
মাত্র নয় বছর বয়সে কিশোর জেরার্ডের আগমন ঘটে লিভারপুলের যুব ফুটবল একাডেমিতে। ১৮ বছর বয়সে ক্লাবটির মূল দলে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পাঁচ বছরের ভেতরেই জেরার্ড যখন বাহুতে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেন, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় আবেগ আর প্রত্যাশার এক অমোঘ প্রতিচ্ছবি।

অন্য যেকোনো পেশাদার ফুটবলারের জন্য ফুটবল স্রেফ ক্যারিয়ার হলেও জেরার্ডের কাছে তা হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। আর সেই পরিচয়টার পুরোটাজুড়েই শুধু একটাই নাম, লিভারপুল। খোদ জেরার্ডই অকপটে স্বীকার করেছেন, লিভারপুলের হয়ে একটি ট্রফি জেতার মাহাত্ম্য তাঁর কাছে অন্য কোনো ক্লাবে দশটি ট্রফি জেতার চেয়েও মধুর!
এর পেছনের কারণ একটাই। জেরার্ডের কাছে নিজ জন্মশহরের মানুষদের বুক ভেঙে অন্য কোনো ক্লাবের হয়ে খেলা ছিল অসম্ভব। তীব্র গৃহকাতরতা বা ‘হোমসিকনেস’ আর শিকড়ের টানই তাঁকে বছরের পর বছর ধরে আটকে রেখেছিল অ্যানফিল্ডের মায়ায়। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অলরেডদের হয়ে মাঝমাঠে নিজের রাজত্ব কায়েম করে ইউরোপীয় শিরোপাসহ নয়টি কাপ শিরোপা জয় করলেও প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা কখনোই ছুঁয়ে দেখতে পারেননি জেরার্ড!
অথচ, ২০০৫ সালেই চেলসি সভাপতি রোমান আব্রামোভিচের অঢেল অর্থ নিয়ে বরেণ্য কোচ হোসে মরিনহো জেরার্ডকে দলে ভেড়াতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ক্লাবটি তখন প্রিমিয়ার লিগে দাপট দেখাচ্ছে, আর লিভারপুল ভুগছে এক যুগ ধরে লিগ শিরোপা খরায়।
ব্লুজদের জার্সিতে প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি জেতার হাতছানি আর লিভারপুলের প্রতি ভালোবাসার দোলাচলে জেরার্ড প্রায় ট্রান্সফার রিকোয়েস্ট দিয়েই বসেছিলেন সে সময়ে। কিন্তু অলরেড ভক্তদের তীব্র ক্ষোভ, বাবার সাথে আলোচনা আর নিজের ভেতরের স্ববিরোধী উপলব্ধি বদলে দেয় সব। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করে নিজের সোনালী ক্যারিয়ারের পুরোটা সঁপে দেন অ্যানফিল্ডের চিরচেনা সবুজ গালিচায়!

মাঠে জেরার্ড আসলে কেমন ছিলেন? ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লিভারপুলে তাঁর সর্তীথ হিসেবে খেলা জাবি আলোনসোর মতে, জেরার্ডের পাসিং রেঞ্জ ছিল অনন্য। সাথে ছিল তাঁর বিস্ফোরক গতি আর মাঠের খেলা পড়ায় দুর্দান্ত দূরদর্শিতা।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা চেলসির মতো খুব শক্তিশালী স্কোয়াড লিভারপুলের না থাকলেও, পুরো দলটাকেই সাজানো হতো জেরার্ডকে কেন্দ্র করে। জাবি আলোনসোর পাশে কিংবা তোরেস ও সুয়ারেজের ঠিক পেছনে জেরার্ড সবসময় অবাধ ট্যাকটিক্যাল স্বাধীনতা নিয়ে খেলতে দারুণ স্বচ্ছন্দ ছিলেন।
অনবদ্য পাসিং অ্যাকিউরেসি, বক্স থেকে বক্সে দৌঁড়ে দলকে বিপদ থেকে রক্ষা করার প্রবণতা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দূরপাল্লার শটে লক্ষ্যভেদের ঝলক দেখিয়ে জেরার্ড লিভারপুলের মধ্যমাঠ নিয়ন্ত্রণের এক আইকনিক চরিত্রে পরিণত হন। ক্লাবটির হয়ে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ৫০৪ ম্যাচ খেলে ১২০ গোল করেন তিনি।
তবে, প্রিমিয়ার লিগের পরম আরাধ্য ট্রফি জেরার্ডের ভাগ্যে না জুটলেও ইউরোপীয় আঙিনা আর এফএ কাপে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। একা হাতে তিনি দলকে টেনে নিয়ে গেছেন ২০০৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ২০০১ ও ২০০৬ সালের এফএ কাপ আর উয়েফা কাপ জয়ের অনন্য শিখরে। তাঁর অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের বদৌলতে সেই ফাইনালগুলোকে ‘দ্য জেরার্ড ফাইনালস’ নামে আখ্যা দেন ফুটবল বোদ্ধারা।

কিন্তু, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইংল্যান্ডের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর অংশ হওয়া সত্ত্বেও জেরার্ড ছিলেন এক আক্ষেপের নাম। ট্যাকটিক্যাল অনমনীয়তা আর ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের সাথে একই মিডফিল্ডে তাঁর সমন্বয় সাধনে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি ম্যানেজারদের ভুল সিদ্ধান্তের জেরে জাতীয় দলের জার্সিতে খুব একটা জ্বলে ওঠা হয়নি জেরার্ডের। অবশ্য তখনকার ইংল্যান্ড দল আসলেই কোনো শিরোপা জিততে ইউরো বা বিশ্বকাপে সবটা উজাড় করে খেলত কি-না, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন!
এরপরও ক্লাব পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য জেরার্ড স্বীকৃতি পেয়েছেন বহুবার। ২০০৫ সালে তিনি উয়েফা ক্লাব ফুটবলার অব দ্য ইয়ার এবং ২০০৬ সালে পিএফএ প্লেয়ার’স প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার সম্মাননা পান তিনি। ২০১৬ সালে মেজর লিগ সকারের এলএ গ্যালাক্সিতে ক্যারিয়ারের ইতি টানা এই কিংবদন্তি ২০২১ সালে প্রিমিয়ার লিগের ‘হল অব ফেইম’-এও জায়গা করে নেন!
আধুনিক ফুটবলে যেখানে ট্রফি দিয়ে খেলোয়াড়ের শ্রেষ্ঠত্ব মাপা হয়, সেখানে জেরার্ড দেখিয়েছেন—নিজ কমিউনিটির প্রতি লয়ালটিও ট্রফি ক্যাবিনেটের চেয়ে কতটা মহিমান্বিত হতে পারে। ট্রফির শোকেস অপূর্ণ রেখেও তাই তিনি মেলে ধরেছেন এক ক্লাবের প্রতি আজীবন আনুগত্যের অনন্য কীর্তি!











