পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে টি-টোয়েন্টি লিগ চলুক না কেন—ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ(আইপিএল), বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল), পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) কিংবা লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (এলপিএল)—ডেথ ওভার স্পেশালিস্টের কথা উঠলে একটা নামই সবার আগে আসে, মুস্তাফিজুর রহমান।
কোনো অধিনায়কই ১৯তম ওভারটা অন্য কাউকে দিতে চান না, যদি হাতে মুস্তাফিজ থাকেন। ম্যাচ যত টানটান হোক, যত চাপের মুহূর্তই আসুক, বল তার হাতে তুলে দেওয়া মানেই অধিনায়কের একটা স্বস্তি। বেশিরভাগ সময়ই তিনি সেই আস্থার প্রতিদান দেন, মাঠে নামিয়ে আনেন এক টুকরো জাদু। উইকেট না পেলেও অন্তত একটা কিছু করে দেখান তিনি, কয়েকটা ডট বল, ব্যাটসম্যান কে প্রেসারে ফেলা এক স্পেল, যা মুহূর্তেই পাল্টে দিতে পারে ম্যাচের রং।
অথচ এই মুস্তাফিজই এখন আর প্রথম দিকের সেই মুস্তাফিজ নন। ২০১৫ সালে অভিষেকের সময় যে গতি আর কাটার দিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেই ধার কিছুটা কমেছে।
কাঁধের চোট আর অস্ত্রোপচারের পর তার বলের গতি আগের মতো নেই, ব্যাটসম্যানরাও তার বিখ্যাত কাটার অনেকটাই পড়ে ফেলতে শিখেছেন। একটা সময় ডেথ ওভারে রান দেওয়ার প্রবণতাও বেড়ে যায় তার, ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। ইনজুরির ঝুঁকি এড়িয়ে ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতে এক পর্যায়ে টেস্ট ছেড়ে দিয়ে পুরো মনোযোগ দেন সাদা বলের ক্রিকেটে।

আর এখানেই লুকিয়ে আছে তার আসল গল্প। গতি কমেছে বলে থেমে যাননি মুস্তাফিজ, বরং নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। কাটারের পাশাপাশি এখন তার অস্ত্র স্লোয়ার, ওয়াইড ইয়র্কার আর লেংথের সূক্ষ্ম বৈচিত্র্য। ব্যাটসম্যান আন্দাজ করার আগেই বুঝিয়ে দেন, পরের বলটা কেমন আসবে সেটা বলা কঠিন।
ফলাফল—আগের চেয়ে হয়তো কম আক্রমণাত্মক দেখতে লাগে তাকে, কিন্তু ডেথ ওভারে কার্যকারিতায় এখনো তিনি বিশ্বের সেরাদের কাতারে। কোনো লিগে গেলেই তার পরিচয় একটাই, শেষের ওভারগুলোর নির্ভরযোগ্য ভরসা। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে করেছে আরও ঠান্ডা মাথার আর হিসেবি, চাপের মুহূর্তে কোন বলটা কাজে দেবে সেটা তিনি এখন বুঝে নেন সহজেই চেনা শিকারির মতো।
এই ধারাবাহিকতার স্বীকৃতিও এসেছে ২০২৬ সালের শুরুতে। ক্রিকেট বিশ্লেষক ওয়েবসাইট উইজডেনের বর্ষসেরা টি-টোয়েন্টি একাদশে জায়গা পেয়েছেন মুস্তাফিজ, যেখানে জাসপ্রিত বুমরাহর পরই সবচেয়ে কার্যকর মিতব্যয়ী বোলার হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন তিনি। বিশ্বের সেরা পেসারদের তালিকায় এভাবে জায়গা পাওয়াটাই বলে দেয়, গতি বা কাটারের সেই পুরোনো তীক্ষ্ণতা না থাকলেও মুস্তাফিজের কার্যকারিতা এখনো প্রশ্নাতীত।
শেষ ওভারে বল হাতে দৌড়ে আসা মুস্তাফিজকে দেখলে ব্যাটসম্যানের মনে যে চাপটা তৈরি হয়, সেটাই বলে দেয় কেন তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের সত্যিকারের এক ‘স্পেশাল ওয়ান’। বয়স বেড়েছে, গতি কমেছে, তবু মাঠে নামলেই কিছু একটা বিশেষ ঘটাবেন, এই বিশ্বাসটা এখনো অটুট আছে তার ওপর।












