চে গুয়েভারা অরণ্যে রাইফেল হাতে বিপ্লব করেছিলেন, আর ডিয়েগো ম্যারাডোনা সেই একই বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন ফুটবল মাঠে। শোষিত আর অবহেলিত মানুষের হয়ে ধনী পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে তাঁর বাঁ পায়ের লড়াই ইতালির নেপলস শহরকে এনে দিয়েছিল পরম মুক্তি।
আশির দশকে ইতালীয় ফুটবলে ছিল তীব্র সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য। উত্তরের ধনী, প্রভাবশালী আর আভিজাত্যে মোড়ানো দলগুলোর কাছে ইতালির দরিদ্র দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে নাপোলি ক্লাবের খেটে খাওয়া সমর্থকেরা ছিল শুধুই তাচ্ছিল্য আর বর্ণবাদী গালমন্দের পাত্র।
গ্যালারিজুড়ে নেমে আসা অপমান আর অবহেলায় কোণঠাসা হয়ে পড়া সেই মানুষগুলোর তখন কেবল একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন ছিল না। তাদের দরকার ছিল শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো এক অদম্য বিপ্লবীর।

ঠিক সেই ঐতিহাসিক শূন্যতা পূরণ করতেই স্প্যানের ঝলমলে আলো ছেড়ে নেপলসের বন্দরে পা রেখেছিলেন বুয়েনস আইরেসের বস্তি থেকে উঠে আসা এই বাঁ-পায়ের জাদুকর। বার্সেলোনা থেকে তাঁকে উড়িয়ে আনার অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে নাপোলির অভাবগ্রস্ত সাধারণ মানুষ নিজেদের শেষ জমানো সম্বলটুকু উজাড় করে দিয়েছিল। যে শহরের মানুষ দিনে এনে দিনে খায়, তারা তাদের হৃদস্পন্দনকে বরণ করে নিতে গড়েছিল এক নজিরবিহীন আত্মিক মেলবন্ধন।
সবুজ ঘাসের মাঠে নেমে তিনি ইতালীয় ফুটবলের শতবছরের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার মানচিত্র তছনছ করে দিলেন। একের পর এক মায়াবী ড্রিবলিং আর নিখুঁত শটে পরাস্ত করলেন উত্তরের দাম্ভিক পরাশক্তিগুলোকে। ক্লাবটিকে প্রথম সিরি আ শিরোপা আর ইউরোপীয় গৌরব উপহার দেওয়ার চেয়েও বড় কথা – তিনি সেই বঞ্চিত মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মান আর মাথা উঁচু করে বাঁচার শক্তি।
মাঠের এই রাজকীয় দেবত্বের আড়ালেই বাস করত এক ঘোর অন্ধকার জীবন। নেপলসের অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রক কামোরা মাফিয়া পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, কোকেন ও মাদকের বিষাক্ত থাবা, আর আইনি নানা বিতর্কে জড়িয়ে ম্যারাডোনা বারবার পতনের খাদে গিয়ে পড়েছেন।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে অশ্রুসজল চোখে মাঠ ছাড়ার ঘটনাটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম করুণ ট্র্যাজেডি। তিনি কখনো কোনো ধরাছোঁয়ার বাইরের নিষ্কলঙ্ক সাধু হতে চাননি। বরং নিজের সব ভুলভ্রান্তি, আবেগ ও পাপ নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন রক্তমাংসের এক অসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে।
নেপলসের কাছে তাঁর এই মানবিক ত্রুটি কোনো দিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ মানুষ কোনো নিখুঁত কাল্পনিক দেবতাকে নয়, ভালোবেসেছিল তাদেরই দু:খ-কষ্টের সঙ্গী হওয়া এবং অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানো এক জীবন্ত মহাকাব্যকে। সময় হয়তো তাঁর পার্থিব শরীরকে মুছে দিয়েছে, কিন্তু অধিকারহারা মানুষের ক্ষোভ, আনন্দ আর নান্দনিক বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে তিনি বেঁচে রইলেন চিরন্তন ইতিহাসে।











