ম্যাচটা মাঠে গড়ানোর আগেই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল অন্য জায়গায়। ফিফার নিষেধাজ্ঞার শাস্তি হিসেবে এই আন্তর্জাতিক উইন্ডোর দুই ম্যাচে গ্যালারির অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখতে হবে। এই শাস্তি কাটাতেই তিন ম্যাচের সূচি সাজিয়েছিল আর্জেন্টিনা, আর সামনে অপেক্ষা করছে লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচ, যার ৮৫ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে হাতে গোনা কয়েক মিনিটে।
পুরো বুয়েনস আয়ার্স সেদিনের জন্য সেজে উঠছে, অথচ সেই রাতে যদি স্টেডিয়ামের অর্ধেক খালি পড়ে থাকে, এর চেয়ে বড় আক্ষেপ আর কী হতে পারে? ঠিক এই কারণেই বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে ম্যাচটা জেতার চেয়েও বেশি দরকার ছিল ম্যাচটা হওয়া।
কিন্তু হওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। মরক্কোয় আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের বাছাই খেলতে থাকা বুরকিনা ফাসোর চার্টার ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়, খেলোয়াড়েরা খবরটা পান বিমানবন্দরে গিয়ে। নিয়মিত ফ্লাইটে আর্জেন্টিনায় যেতে রাজি ছিলেন না তাঁরা। বিমান ঠিক হওয়ার পরও ঝামেলা মেটেনি, শোনা গেল দেশের ফুটবল সংস্থার সঙ্গে বেতন-বোনাস নিয়ে বিরোধ চলছে, আর এই ম্যাচকেই নাকি দরকষাকষির হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত ম্যাচ বাতিল হবে, না পিছিয়ে যাবে, কেউ নিশ্চিত ছিল না। আর পিছিয়ে গেলে মেসির বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হতো, কারণ দুই দিনের ব্যবধানে একই মাঠে বেনিনের বিপক্ষে খেলা আছে আর্জেন্টিনার।
সব জল্পনা শেষে ম্যাচটা হলো, তবে যে দলটা মাঠে নামল সেটাকে ঠিক বুরকিনা ফাসোর মূল দল বলা যায় না। বেশির ভাগ তারকা খেলতে না আসায় কোচকে ডাকতে হয়েছে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের ছেলেদের, সঙ্গে মূল দলের একমাত্র মিডফিল্ডার চেক বেবেল।
প্রায় ১২ ঘণ্টার আকাশপথ পেরিয়ে তাঁরা বুয়েনস আয়ার্সে নামলেন ম্যাচ শুরুর মাত্র সোয়া পাঁচ ঘণ্টা আগে। জেট ল্যাগ কাটানোর সময় নেই, অনুশীলনের প্রশ্নই ওঠে না, হোটেলে কিছুক্ষণ জিরিয়েই সোজা মাঠের পথে। বিশ্বকাপের রানার্সআপ দলের সামনে এই অবস্থায় নামলে গোলের মালা পরতে হওয়াই বোধ হয় স্বাভাবিক ছিল।

হলোও তাই, ম্যাচের শুরুর দিকেই পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা, লাউতারো মার্তিনেজের শট ঠেকিয়ে দিলেন গোলকিপার, কিন্তু ফিরতি বলে জাল খুঁজে নিলেন লাউতারো নিজেই। কয়েক মিনিট পর জুলিয়ান আলভারেজের শট ঠেকাতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল ঢুকিয়ে দিলেন বুরকিনার ডিফেন্ডার। ১২ মিনিটে লাউতারোর পাস থেকে নিচু শটে গোল করলেন জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি, ৩৫ মিনিটে নিকো পাজ, আর পরের মিনিটেই প্রেস্তিয়ান্নির বাড়ানো বলে আলভারেজ।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই স্কোরলাইন ৫-০। আলভারেজের গোলটা ছিল মৌসুমে তাঁর প্রথম জালের দেখা পাওয়া, গোলের পর দুই হাত তুলে তিনি স্মরণ করালেন মেসিকে, আর ঠিক এখানেই ম্যাচটা যেন অন্য একটা মাত্রা পেয়ে গেল।
বিরতির পর স্কালোনি একের পর এক পরিবর্তন আনলেন, মেসি-পরবর্তী যুগের জন্য নতুন মুখগুলোকে বাজিয়ে দেখার এটাই যে সুযোগ। তাতে ছন্দ একটুও কমল না, ৫৭ মিনিটে বদলি নামা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুনো করলেন ষষ্ঠ গোল, আর যোগ করা সময়ে জুলিয়ানো সিমিওনের গোলে ৭-০ হলো ব্যবধান।

পরিসংখ্যানও বলে দেয় ম্যাচটা কতটা একতরফা ছিল। ৭৫ শতাংশ বল দখলে রেখে আর্জেন্টিনা শট নিয়েছে ৩০টি, যার ১৭টি লক্ষ্যে, আর বুরকিনা ফাসো নিয়েছে মাত্র তিনটি, লক্ষ্যে ছিল একটি। স্কালোনির অধীনে এটা আর্জেন্টিনার যৌথভাবে সবচেয়ে বড় জয়, ২০২৩ সালে কুরাসাওকেও এই ব্যবধানেই হারিয়েছিল দলটা।
মজার ব্যাপার হলো, এত ঝক্কি সয়ে খেলতে আসার জন্য বুরকিনা ফাসোর ছেলেরা ম্যাচের শুরুতে গ্যালারি থেকে ধন্যবাদের করতালিও পেয়েছে, আর শেষ বাঁশির পর দুই দলের খেলোয়াড়েরা হাত মেলালেন বুকে বুক লাগিয়ে, দেখে বোঝার উপায় ছিল না ম্যাচটা এমন একপেশে হয়েছে। বলিভিয়াকে ৪-০ আর বুরকিনা ফাসোকে ৭-০, দুই ম্যাচে ১১ গোল করে স্কালোনি অন্তত এটুকু বুঝিয়ে দিলেন, নিষেধাজ্ঞার ভয়, ম্যাচ বাতিলের শঙ্কা সব পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনা ঠিকই মেসির বিদায়ের মঞ্চ প্রস্তুত করে ফেলেছে।
এবার শুধু অপেক্ষা বুধবারের, যেদিন পুরো গ্যালারি ভরা থাকবে, কারণ সেই রাতে শেষবারের মতো নীল-সাদা জার্সিতে দেখা যাবে তাঁকে












