​প্রতিভার অপচয় নাকি নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাস?

এক চিরকালীন কাব্যিক ও বেদনাবিধুর নাম - ইরফান পাঠান। সুইংয়ের জাদুকর থেকে শুরু করে আকস্মিক স্রোতের বিপরীতে ছিটকে যাওয়া। ইরফানের জীবন ও ক্যারিয়ার যেন এক ক্লাসিক্যাল ট্র্যাজেডি।

ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছে, যারা প্রতিভার চেয়েও বেশি নিজেদের লড়াইয়ের দ্যুতি দিয়ে চেনার গণ্ডি পেরিয়ে গেছেন। তেমনই এক চিরকালীন কাব্যিক ও বেদনাবিধুর নাম – ইরফান পাঠান। সুইংয়ের জাদু থেকে শুরু করে আকস্মিক স্রোতের বিপরীতে ছিটকে যাওয়া। ইরফানের জীবন ও ক্যারিয়ার যেন এক ক্লাসিক্যাল ট্র্যাজেডি।

বরোদা থেকে উঠে আসা সেই তরুণ বাঁহাতি পেসার যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন, তখন বাতাসে ছিল এক নতুন জাগরণের সুবাস। কপিল দেবের উত্তরসূরি খোঁজার ক্লান্ত মিছিলে ইরফান যেন এক ঝটকায় সব আশার আলো হয়ে ধরা দিয়েছিলেন।

২০০৪ সালের পাকিস্তান সফর তো কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ছিল না, তা ছিল ইরফানের মুকুটে মণিহীন রাজার মতো নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মহাকাব্য। লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে টেস্টের প্রথম ওভারেই সালমান বাটের স্টাম্প ছিটকে দেওয়া কিংবা মুলতানে তাঁর সেই চোখ জুড়ানো সুইং – সব মিলিয়ে সেসময়ের ক্রিকেট বিশ্ব এক নতুন জাদুকরের জন্ম দেখছিল।

 

তবে ক্রিকেটের পথ কখনো মসৃণ হয় না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে অনেক সময়ই প্রতিভার আসল দাবি ঢাকা পড়ে যায়। ইরফানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁক বদলটি ঘটেছিল গ্রেগ চ্যাপেল অধ্যায়ে।

ব্যাটিংয়ের মার্জিত শৈলীতে তাকে ওপেনিংয়ে নামানো হলো।  টেস্ট সেঞ্চুরিও করলেন। কিন্তু সেই অতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বলি হয়ে হারিয়ে গেল তাঁর সহজাত বোলিংয়ের ধার। দল যখন তাকে এক বহুমুখী অলরাউন্ডার হিসেবে দেখতে শুরু করল, তখন তাঁর ভেতরকার মূল বোলারটি যেন আস্তে আস্তে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ল।

গতি কিছুটা কমিয়ে সুইংয়ের নিখুঁত রাজত্বে থিতু হতে চাওয়া মানুষটিকে হঠাৎ করেই আধুনিক ক্রিকেটের নির্মম রূঢ়তার মুখোমুখি হতে হলো। বাদ পড়ার বেদনা, দলে ফেরার আকুতি আর প্রতিবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য জেদ – এই তিনের আবর্তেই কেটেছে তার স্বর্ণালী দিনগুলোর পরবর্তী অধ্যায়।

কিন্তু ইরফানের ক্যারিশমা শুধু ওই পরিসংখ্যানের পাতায় আটকে থাকেনি। ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল, যেখানে জোহানেসবার্গের আকাশে ভারতের তেরঙ্গা ওড়ার নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল তাঁর সেই জাদুকরী তিন উইকেটের স্পেল।

পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই স্নায়ুক্ষয় করা ফাইনালে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ছাই থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তার রক্তেই আছে। চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত ইয়র্কার কিংবা সুইংয়ের পসরা সাজিয়ে বসা ইরফান মানেই ছিল এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের চিত্রনাট্য।

আজ যখন তিনি ধারাভাষ্যের দীর্ঘ পরিসরে কিংবা ক্রিকেট বিশ্লেষণে নিজের চেনা কণ্ঠস্বর নিয়ে হাজির হন, তখন তাঁর চোখে মুখে কোনো আক্ষেপের কালো মেঘ দেখা যায় না। বরং জীবনের সব প্রাপ্তি আর হারিয়ে ফেলার বেদনাকে সঙ্গী করে তিনি এক পরিণত সত্তা। ইরফান পাঠান কেবল একটি নাম নয়। তিনি বরোদার সুদূর প্রান্তর থেকে শুরু করে বিশ্বমঞ্চের আলো ছড়ানো এমন এক বাঁহাতি দ্রোহী, যিনি ক্রিকেটকে ভালোবেসেছিলেন নি:শর্তে, আর বিনিময়ে এ খেলাটি তাকে দিয়েছে এক অখণ্ড জীবন্ত ইতিহাস।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link