লড়াই করে বাঁচার গান

ওয়ানডে দিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু। সেটা ১৯৯৯ সালের কথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শারজাহতে সেই ম্যাচে দু’দলে যারা খেলেছিলেন – তারা এখন আর যাই হোক কেউই কোনোপ্রকার প্রতিযোগীতামূলক ম্যাচ খেলেন না। সেখানে শোয়েব মালিক দিব্যি খেলে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। কত হাজার বার তিনি বাদ পড়েছেন, ফিরেছেন লড়াই করে – সেই লড়াইকে মনে রাখতে বাধ্য ক্রিকেট!

এখনো দাপটের সাথে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন এর মধ্যে কেবল একজনেরই অভিষেক হয়েছে সেই নব্বই দশকে। তিনি কেবল পরিশ্রম, ধের্য্য আর অধ্যাবসয়ের দারুণ এক প্রতিমুর্তিই নন, বিরাট এক সব্যসাচী ক্রিকেটারও বটে। ওয়ানডেতে ১ থেকে ১০ – মোট দশটা পজিশনে ব্যাট করেছেন। মানিয়ে গেছেন যেকোনো পরিস্থিতির সাথে।

কেবল ওয়ানডেতে নয়, টেস্টেও তাই। একটা সময়, নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি ছিলেন লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান। কালক্রমে মিডল অর্ডার-টপ অর্ডারে খেলেছেন। তাঁকে দিয়ে সাদা পোশাকে ইনিংসের উদ্বোধনও করিয়েছে পাকিস্তান।

ইনজুরি কিংবা অফ ফর্ম – নানা কারণে তিনি দল থেকে বাইরে গেছেন। তাঁকে দিয়ে আর আধুনিক ক্রিকেট চলে না – এমন বলার লোকের কোনো অভাব ছিল না। তবে, বারবার তিনি সব গুজব, গুঞ্জন আর সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে ফিরিয়েছেন, দাপটের সাথে পারফর্ম করেছেন।

তিনি জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে গিয়ে, সীমান্ত বিরোধ উপেক্ষা করে বিয়ে করেছেন ভারতীয় টেনিস কিংবদন্তি সানিয়া মির্জাকে। কখনোই তাঁদের সংসার নিয়ে খুব বেশি কানাঘুষা শোনা যায়নি। রক্ষণশীলতা তিনি ভেঙেছেন বারবার। কখনো সমালোচকদের মুখে কুলুপ এঁটেছেন, কখনো সামাজিক অসাম্যতার বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর নামটা আর না বলে দিলেও চলে। তিনি শোয়েব মালিক। নব্বই দশক থেকে শুরু করে আজো দাপটের সাথে চলছে তাঁর ব্যাট। কেবল খেলার জন্য খেলা নয়, রীতিমত ব্যাট দিয়ে ছড়ি ঘুরিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আজো যেকোনো দলে সুযোগ পান বড় পারফরমার হিসেবেই।

পাকিস্তানি গ্রেট – এর মানেই তিনি জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। শোয়েব মালিকও এর ব্যতিক্রম নন। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর খুব একটা সাফল্য নেই। তবে, এর মধ্যেও ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাঁর নেতৃত্বেই ফাইনাল খেলেছিল মিসবাহ উল হকরা।

ক্রিকেটীয় প্রেক্ষাপটে মালিক কখনোই হয়তো গ্রেটদের কাতারে পড়বেন না। সব ফরম্যাটের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মিলিয়ে ১২ হাজারের মত রান, ২০০’র মত উইকেট – তাঁকে মহাকালের মনে রাখার কোনো কারণ নেই। কিন্তু, যখন শুনবেন এটা করতে গিয়ে তাঁর সংগ্রাম আর একাগ্রতার কথা – তখন আপনি তাঁকে মনে রাখতে বাধ্য।

ওয়ানডে দিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু। সেটা ১৯৯৯ সালের কথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শারজাহতে সেই ম্যাচে দু’দলে যারা খেলেছিলেন – তারা এখন আর যাই হোক কেউই কোনোপ্রকার প্রতিযোগীতামূলক ম্যাচ খেলেন না। সেখানে শোয়েব মালিক দিব্যি খেলে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। কত হাজার বার তিনি বাদ পড়েছেন, ফিরেছেন লড়াই করে – সেই লড়াইকে মনে রাখতে বাধ্য ক্রিকেট!

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অবশ্যই তিনি কিংবদন্তি। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল), বিগ ব্যাশ, পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল), বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল), ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল) কিংবা ইংলিশ কাউন্টি – কোনো কিছুই বাদ রাখেননি। টি-টোয়েন্টিতে ১০ হাজারের ওপর রান আর ১৫০-এর ওপর উইকেট তাঁর সামর্থ্যের যথার্থ প্রমাণ দেয়। বোলিং অ্যাকশনজনিত সমস্যা না হলে উইকেটসংখ্যা নি:সন্দেহে আরো বাড়তো।

শোয়েব মালিকের একাগ্রতা, দলের প্রতি নিবেদন, টিমম্যানশিপ কিংবা পরিশ্রম-অধ্যাবসায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো জায়গা নেই। তবে, তাঁকেও পাকিস্তান শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণ দেখিয়ে এক বছরের নিষিদ্ধ করেছিল ২০১০ সালে। তখন, অনেকেই ধরে নিয়েছিল – ক্যারিয়ারটা বুঝি শেষই হয়ে গেল এবার। কিন্তু, টিপিকাল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) দুই মাসের মধ্যে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল।

টেস্টে কখনোই তিনি খেলতেন না নিয়মিত। ২০১০ সালের পর খেলছিলেন না একদমই। ২০১৫ সালে হঠাৎ করেই তাঁকে ফেরানো হল। ফিরেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবুধাবিতে খেললেন ২৪৫ রানের অভাবনীয় এক ইনিংস। যদিও, সেই সিরিজেই বিদায় বলে দেন সাদা পোশাককে। ২০১৯ বিশ্বকাপ খেলার লক্ষ্য নিয়ে সাদা পোশাকের চাপটা কমিয়ে ফেলাই তাঁর কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছিল।

ভুল ছিলেন না মালিক। ঠিকই তিনি ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সেই বিশ্বকাপ শেষেই বিদায় বলে দেন ওয়ানডে ক্রিকেটকে। তাঁর লক্ষ্য ছিল আর একটা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সেটা ২০২১ সালে খেলে ফেলেছেন। শেষটা শিল্পীর তুলির আঁচড়ে রাঙিয়ে দিতে পারলে পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টির শিরোপা খরাও কেটে যেত, সেটা হয়নি। পাকিস্তানের যাত্রা শেষ হয়েছে সেমিফাইনালে গিয়ে। মালিক অবশ্য পারফরম করেছেন,  সেই জোরেই কি না আজো বিদায়ের ঘোষণা দেননি। মালিকের দৌঁড় কোথায় গিয়ে থামবে – কে জানে!

পাকিস্তানের স্ট্রিট ক্রিকেট থেকে টেপ টেনিস খেলে আসা ক্রিকেটার তিনি। শিয়ালকোটে এই করেই কেটেছে তাঁর শৈশব। পরিবার চাইতো পড়াশোনা, আর তিনি থাকতেন ক্রিকেটে বুঁদ হয়ে। সেই লড়াইয়েও জয় হয় ক্রিকেটেরই।

সেই ক্রিকেটই তাঁকে এনে ‍তুলে দেয় স্বয়ং ইমরান খানের হাতে। ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে শিয়ালকোটে এক ক্রিকেট ক্লিনিকের আয়োজন করেন ইমরান। সেখানে আসেন শোয়েব মালিক। এরপর ইতিহাস, শুরু হয় লড়াই করে বাঁচার অনন্য এক গান!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...