২০১৮ সালের ১০ জুন। কুয়ালালামপুরের কিনরারা একাডেমি ওভালের আকাশ ঘনিয়ে আসছিল এক নাটকীয় সমাপ্তির দিকে। ক্রিকেট ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে বিজয়ের মঞ্চটা সেদিন শুধুই ভারতের হওয়ার কথা ছিল। যাদের নামের পাশে টানা ছয়বারের এশিয়া কাপ শিরোপার ভারী রেকর্ড। কিন্তু সেই অপরাজেয় দুর্গ চুরমার করে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছিল বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল।
শেষ বলের রোমাঞ্চে ছয় উইকেটের জয়ে লাল-সবুজের মেয়েরা কুয়ালালামপুরের বুকে উড়িয়েছিল সাফল্যের চিরসবুজ পতাকা। অথচ টুর্নামেন্টের আগে বাংলাদেশকে রাখা হয়নি কোনো সম্ভাবনার তালিকায়। তবে সালমা খাতুনদের চোখে ছিল অন্য এক স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
গ্রুপ পর্বে টুর্নামেন্টের অন্যতম দাবিদার ভারতকে হারিয়েই প্রথম বার্তাটি দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ফাইনালে মুখোমুখি হওয়া মানে একেবারে নতুন এক যুদ্ধ। ভারত দল সেখানে ফেভারিট, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তবুও ম্যাচের শুরু থেকেই টাইগ্রেসদের মানসিকতায় ছিল অদ্ভুত এক নির্ভীকতা।

টস জিতে ভারতকে প্রথমে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে পেস আর স্পিনের নিখুঁত মিশেলে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে বাংলাদেশ। রুমানা আহমেদ ও খাদিজাতুল কুবরার আঁটসাঁট বোলিংয়ের সামনে খাবি খেতে থাকে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপ। নির্ধারিত ২০ ওভারে নয় উইকেটে মাত্র ১১২ রানে থমকে যায় ভারতের ইনিংস।
১১৩ রানের আপাতদৃষ্টে সহজ লক্ষ্য হলেও ফাইনালের স্নায়ুচাপ ম্যাচকে টেনে নিয়ে যায় কঠিন সমীকরণে। শারমিন সুলতানা ও ফারজানা হকের বিদায়ের পর অভিজ্ঞ নিগার সুলতানা ও রুমানা আহমেদের ব্যাটে ম্যাচ রূপ নেয় রোমাঞ্চকর এক নাটকে।
জয়ের জন্য শেষ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৯ রান। ভারতের অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌরের শেষ ওভারটি যেন পরিণত হয় রূপকথার চূড়ান্ত অঙ্কে। প্রতিটি বলের সাথে থমকে যাচ্ছিল হাজারো মানুষের হৃদস্পন্দন। শেষ দুই বলে দুই রানের সমীকরণে পঞ্চম বলে রুমানা আহমেদ রানআউট হলে ম্যাচে নেমে আসে এক মূহুর্তের নিস্তব্ধতা।

শেষ বল, প্রয়োজন এক রান। ক্রিজে জাহানারা আলম। হারমানপ্রীতের ভাসানো বলটিকে আলতো করে মিডউইকেটে ঠেলে দিয়েই দিলেন জীবনপণ দৌড়। ভারতের ফিল্ডার বল কুড়িয়ে উইকেটে মারার আগেই জাহানারা ডাইভ দিয়ে নিরাপদে পৌঁছালেন পপিং ক্রিজে। এক রান পূর্ণ হতেই ডাগআউট থেকে ছুটে এলেন সতীর্থরা। কুয়ালালামপুরের বুক চিরে গর্জে উঠল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে ২০১৮ সালের এই এশিয়া কাপ জয় কেবল একটি ট্রফি জয়ের হিসাব নয়, এটি ছিল দেশের নারী ক্রিকেটের গতিপথ বদলে দেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা আর সব প্রতিকূলতার উত্তর লাল-সবুজের মেয়েরা দিয়েছিল ব্যাট-বলের রাজসিক লড়াইয়ে। সালমা খাতুনের হাতে যখন ট্রফিটি উঠল, তখন তা কেবল একটি ট্রফি ছিল না – তা হয়ে উঠেছিল এক নতুন ভোরের প্রতীক।











