জলহীন যে বৃষ্টিতে কেটেছিল দুই যুগের খরা

২৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা, ১৩টি ব্যর্থ চেষ্টা আর অজস্র ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাসকে এক নিমেষে মুছে দিয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান ভূখণ্ডে প্রথম টেস্ট বিজয়ের স্বর্ণোজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিল বাংলাদেশ।

রাওয়ালপিন্ডির ২২ গজের পিচে আগস্টের প্রখর রোদ যখন ঠিকরে পড়ছিল, তখন ইতিহাসের পাতায় লেখা হচ্ছিল এক নতুন মহাকাব্য। ২৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা, ১৩টি ব্যর্থ চেষ্টা আর অজস্র ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাসকে এক নিমেষে মুছে দিয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান ভূখণ্ডে প্রথম টেস্ট বিজয়ের স্বর্ণোজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিল বাংলাদেশ।

ম্যাচের শুরুটা ছিল স্বাগতিকদের দাপটে। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেটে ৪৪৮ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে পাকিস্তান যেন পরোক্ষ বার্তা দিয়েছিল – এই উইকেটে তাদেরকে থামানো অসম্ভব। কিন্তু খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ বারবার প্রমাণ করেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

পাল্টা জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে মুশফিকুর রহিমের ১৯১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস যেন ছিল ধৈর্য ও দক্ষতার অনন্য ভাস্কর্য। সঙ্গে লিটন দাস, মুমিনুল হক আর মেহেদী হাসান মিরাজের লড়াকু ফিফটি বাংলাদেশকে পৌঁছে দেয় ৫৬৫ রানের হিমালয়সম উচ্চতায়। ১১৭ রানের লিডে ভর করেই প্রতিপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্গে প্রথম বড় আঘাত হানে বাংলাদেশ।

চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে রাওয়ালপিন্ডির তপ্ত উইকেটে মিরাজ আর সাকিব আল হাসানের ঘূর্ণি জাদুতে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে স্বাগতিক ব্যাটাররা। মিরাজের চারটি আর সাকিবের তিনটি উইকেটে ভর করে পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৪৬ রানে গুটিয়ে যায়।

​জয়ের জন্য শেষ বিকেলে বাংলাদেশের সামনে সমীকরণ দাঁড়ায় মাত্র ৩০ রান। জাকির হাসান ও সাদমান ইসলাম কোনো উইকেট না হারিয়ে অনায়াসেই পৌঁছে যান সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে ৪৪৮ তুলে ঘোষণার পরও ১০ উইকেটের এই বিশাল জয় কেবল স্কোরবোর্ডের জয় ছিল না, তা ছিল আত্মবিশ্বাসের এক নতুন দিগন্ত।

রাওয়ালপিন্ডির বুকে সেদিন অস্ত যাওয়া সূর্যটা আসলে পাকিস্তানের ছিল না, ছিল তাদের বহু বছরের আভিজাত্যের। আর শেষ বিকেলে জাকির-সাদমানের ব্যাটে চড়ে যখন জয়ের সেই ৩০টি রান ছুঁয়ে গেল বাংলাদেশ, তখন পিন্ডির আকাশে কেবল একটি রঙই ভেসে উঠেছিল, রক্তিম সূর্যের মাঝে গাঢ় সবুজ।

​এই জয় কেবল ক্রিকেটীয় স্কোরবোর্ডের কোনো গাণিতিক হিসাব ছিল না। তা ছিল ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে পথ চলা এক নদীর সাগরে গিয়ে মেশার তীব্র অনুভূতি। হাজারো ক্লান্তি, শঙ্কা আর অনিশ্চয়তার মেঘ ভেঙে সেদিন রাওয়ালপিন্ডির সবুজ গালিচায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল লাল-সবুজের পতাকা।

ইতিহাস তার নিজস্ব নিয়মে সত্যকে তুলে ধরে – আর সেদিন ইতিহাস সাক্ষী দিয়েছিল, বিশ্বাস যখন হিমালয়ের মতো অটল হয়, তখন প্রতিপক্ষের দুর্গ যত বিশালই হোক না কেন, তা ধসে পড়তে বাধ্য। সেই ঐতিহাসিক বিকেলটি কেবল একটি জয় লিখে দিয়ে যায়নি, রেখে গেছে অনন্তকালের এক সুর। যা বাংলা ক্রিকেটের হৃদস্পন্দনে বেজে চলবে যুগ থেকে যুগান্তরে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link