আড়ালে থাকা এক চিরন্তন সেনানী

অন্যান্য তারকাদের মতো গ্ল্যামারাস স্কিল আর ট্যাকটিক্যাল অ্যাকিউরেসি না থাকায় রুনিকে নিয়ে কখনোই মিডিয়ার বাড়তি উন্মাদনা চোখে পড়েনি। এরপরও যখনই দল বিপদে পড়েছে, রুনি হয়ে উঠেছেন ত্রাতা। তাই ফুটবলীয় জৌলুসের আড়ালে থাকা এক চিরন্তন সেনানী হিসেবে রুনির নাম প্রতিধ্বনিত হবেই কালের গণ্ডি পেরিয়ে!

স্রেফ স্কোরবোর্ড আর নিরেট পরিসংখ্যানের হিড়িক কখনো কখনো ফুটবলে কিছু খেলোয়াড়ের আসল গল্পটা তুলে ধরার সামর্থ্য রাখে না। বিশেষ করে, তারকাসমৃদ্ধ একটা দলের ক্রান্তিকালে যখন সাধারণ একজন প্লেমেকার বারবার কাণ্ডারির ভূমিকায় আবির্ভূত হন, তখন সবুজ গালিচার নস্টালজিক ফুটবলীয় দৃশ্যগুলোর দিকে ফ্ল্যাশব্যাক করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না! আর সেই চরিত্রটার নাম যদি হয় ওয়েন রুনি, তাহলে তো কথাই নেই!

লিভারপুলের শহরতলি ক্রক্সটেথ থেকে উঠে আসা এই বিস্ময় বালক ছোটবেলায় স্কুল পর্যায়েই অনবদ্য পারফরম্যান্স করে নজর কাড়েন ইংলিশ ক্লাব স্কাউটদের। ডাক পেয়ে যান প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব এভারটনের যুব একাডেমিতে, তা-ও আবার মাত্র ১১ বছর বয়সে। ২০০২ সালে একক পারফরম্যান্সের জোরে এভারটনের যুবদলকে এফএ কাপের ফাইনালে তোলেন উঠতি এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড। টুর্নামেন্টটিতে আট ম্যাচে আট গোল করার বদৌলতে এভারটনের সিনিয়র দলে অভিষেকের দুয়ার খুলে যায় ওয়েন রুনির।

২০০২-০৩ মৌসুমে এভারটনের হয়ে রুনি প্রথম আলোচনায় আসেন শক্তিশালী আর্সেনালের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে। ২০০২ সালের অক্টোবরে তাঁর শেষ মুহূর্তের একমাত্র গোলে ৩০ ম্যাচ ধরে অপরাজিত থাকা আর্সেনাল পরাজয়ের স্বাদ পায়। খোদ আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারও সেদিন তরুণ এই ফুটবলারের খেলার তারিফ করতে বাধ্য হন! ২০০৪ সাল পর্যন্ত এভারটনের হয়ে ৬৭ ম্যাচে ১৫ গোল করেন রুনি।

এই পারফরম্যান্সের দরুন দ্রুতই প্রিমিয়ার লিগ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড নজর দেয় তাঁর ওপর। অবশেষে, ২০০৪-০৫ মৌসুমে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ২৫.৬ মিলিয়ন ইউরোতে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পা রাখেন ওয়েন রুনি।

ঠিক তাঁর আগের বছরে ম্যানইউতে আসেন পর্তুগিজ উদীয়মান তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দলে আছেন পল স্কোলস, রায়ান গিগস, রিও ফার্দিনান্দদের মতো কিংবদন্তিরাও। এত তারকার ভিড়ে দলে নিজের জায়গা পোক্ত করার কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে রুনির জন্য। কিন্তু রুনি তাঁর খেলা দিয়ে প্রমাণ করেন, তিনি চ্যালেঞ্জ নিতেই রেড ডেভিলদের জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। অভিষেক মৌসুমেই তাঁর পিএফএ সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া, সেটারই দলিল!

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ওয়েন রুনিকে। শুরুর দিকে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেললেও, সময়ের সাথে সাথে নিজেকে পুরোদস্তুর প্লেমেকারে পরিণত করেন এই থ্রি লায়ন্স তারকা। দলের প্রয়োজনে যেমন তিনি রক্ষণে নেমে নিঁখুত ইন্টারসেপশানের কারিকুরি দেখান, তেমনই কাউন্টার অ্যাটাকের সময় ডি-বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত শটে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি! এই বক্স-টু-বক্স খেলার ক্লান্তিহীন মানসিকতা আর দলের স্বার্থে ব্যক্তিগত গ্লোরি বিসর্জন দেওয়া রুনিকে করে তোলে অনন্য। আর এই অনন্যতার জোরেই ম্যানইউ ঘরোয়া পরিসর এবং ইউরোপীয় মঞ্চে শিরোপা জয়ের উৎসবে শামিল হয়!

রুনির প্রশস্ত কাঁধে ভর করেই স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে গড়ে তোলেন এক অপরাজেয় সাম্রাজ্য। রেড ডেভিলদের হয়ে মোট ১৬টি ট্রফি জয়ের গৌরব অর্জন করেন রুনি, এর মধ্যে রয়েছে টানা তিনটি প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি এবং ২০০৮ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। পাশাপাশি, ক্লাব বিশ্বকাপ, এফএ কাপ, লিগ কাপ ও উয়েফা ইউরোপা লিগ জিতে সতীর্থ মাইকেল ক্যারিকের পর একমাত্র ইংলিশ খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাব ফুটবলের সম্ভাব্য সব মেজর ট্রফি জেতার অনন্য রেকর্ড গড়েন রুনি।

এখানেই শেষ নয়! ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও পিছিয়ে ছিলেন না ওয়েন রুনি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসে আজও নিজের স্থান ধরে রেখেছেন তিনি ২০৮টি গোল করে। পাশাপাশি তিনি প্রিমিয়ার লিগের একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি ২০০ গোল এবং ১০০ অ্যাসিস্টের অবিশ্বাস্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। ১৩ বছরে ২৫৩টি গোল করে ইংলিশ কিংবদন্তি ববি চার্লটনকে ছাড়িয়ে ম্যানইউয়ের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি।

ইংল্যান্ড জাতীয় দলেও রুনি পরিণত হন পরম আস্থার প্রতীকে। ২০০৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক পথচলা শুরু হয়। এরপর ২০০৪ সালের ইউরোতে চার গোল করে আসরটির সেরা একাদশে জায়গা করে নেন তিনি।

সময়ের পরিক্রমায় ডেভিড বেকহ্যাম, স্টিভেন জেরার্ড, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড বা জন টেরির মতো তারকারা থ্রি লায়ন্স শিবির থেকে বিদায় নেওয়ার পর ধুঁকতে থাকা ইংল্যান্ডের ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড ওঠে রুনির হাতে। রূপান্তরের পর্যায়ে থাকা ইংল্যান্ড দলকেও একাই টেনে তোলেন তিনি। ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ বিশ্বকাপে ইংলিশদের স্বপ্ন দেখাতে চেষ্টা করেন রুনি, অবশ্য ভাগ্য খুব একটা সঙ্গ দেয়নি তাঁকে। এরপরও ১২০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৫৩ গোল করে রুনি হয়ে আছেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। চারবার জিতেছেন ইংল্যান্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার পুরস্কারও।

তবুও অন্যান্য তারকা ফুটবলারদের মতো গ্ল্যামারাস স্কিল আর অভিনব ট্যাকটিক্যাল অ্যাকিউরেসি না থাকায় রুনিকে নিয়ে কখনোই মিডিয়ার বাড়তি উন্মাদনা চোখে পড়েনি। এরপরও যখনই ক্লাব বা জাতীয় দল ঘোর বিপদে পড়েছে, রুনি হয়ে উঠেছেন ত্রাতা। তাই ফুটবলীয় জৌলুসের আড়ালে থাকা এক চিরন্তন সেনানী হিসেবে ওয়েন রুনির নাম প্রতিধ্বনিত হতে থাকবেই কালের গণ্ডি পেরিয়ে!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link