স্ট্রাইকারের সংজ্ঞা বদলেছেন যিনি

ক্ষুরধার গতি, নিখুঁত ফিনিশিং আর সেই মুক্তোঝরা হাসির জাদুতে স্ট্রাইকিংকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া কিংবদন্তি তারকার নাম রোনালদো নাজারিও। দুনিয়া হয়ত অনেক স্ট্রাইকারের কারিকুরি দেখেছে এবং দেখবে, কিন্তু রোনালদোর মতো স্ট্রাইকিংয়ে এভাবে বিপ্লব ঘটাতে পারবেন কজন আর, তা ফুটবল বিধাতাই ভালো জানেন!

সময়টা আশির দশকের শেষ ভাগ। রিও ডি জেনেইরোর অলিতে-গলিতে স্রেফ নিজের পেটের দায় মেটানোর তাগিদে ছোট ছোট ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলে বেড়াচ্ছেন এক কিশোর। নিজের মেধাতেই গড়ছেন গোলের পর গোল করে যাওয়ার কারিকুরি। হ্যাঁ, বলছি ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও দ্য লিমার কথা। যিনি ফুটবলে স্ট্রাইকিংয়ের সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছেন স্ব প্রতিভার আলোতে ভাস্বর হয়ে!

রোনালদোর আগমনের আগে ফুটবলে স্ট্রাইকাররা ছিলেন স্রেফ চতুর গোল শিকারি কিংবা লক্ষ্যভেদে মনোযোগী গতিমান যন্ত্র। কিন্তু রোনালদো এই ধারণা দুটোর নিখুঁত মিশ্রণ ঘটান পায়ের জাদুতে। ঝোড়ো গতিতে বল নিয়ে ড্রিবলিং করা কিংবা তাঁর ট্রেডমার্ক ‘পেডালাডা’-র মাধ্যমে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের ভারসাম্যহীন করে দেওয়ার দৃশ্যগুলো আজও ফুটবলপ্রেমীদের দোলা দেয়।

গোলরক্ষককে ড্রিবল করে ৮৮টি গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ডও আছে তাঁর ঝুলিতে। রোনালদোর এই অনন্য খেলার স্টাইল শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং, এটি ছিল ত্রাস ছড়িয়ে প্রতিপক্ষের মনোবল গুড়িয়ে দেওয়ার মোক্ষম অস্ত্র! এ কারণেই মেসি কিংবা রোনালদিনহোর মতো কিংবদন্তিরাও তাঁকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে মানেন!

ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে এক হতদরিদ্র পরিবারে ১৯৭৬ সালে জন্ম রোনালদোর। ক্ষুধার তাড়নায় ১১ বছরের কিশোর রোনালদো স্থানীয় নানা ইভেন্টে ফুটবল খেলে উপার্জন করতে আরম্ভ করার পর হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করেন তিনি অন্যদের চেয়ে অনেক ভালোভাবে গোল করতে পারেন। তাই ফুটবলকেই পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

প্রথমেই যান প্রিয় ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোতে। কিন্তু আবেগের সঙ্গে ট্রায়ালে পারফরম্যান্সের কাঙ্ক্ষিত সংযোগ ঘটাতে না পারায় বাদ পড়েন তিনি। পরে ক্রুজেইরোর হয়ে ১৬ বছর বয়সে অভিষেক হয় তাঁর। সেই থেকেই ফুটবল খেলে মাঠ মাতানোকে অভ্যাসে পরিণত করেন তিনি। ক্রুজেইরোর হয়ে ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে ৪৭ ম্যাচে ৪৪ গোল করেন রোনালদো। জেতেন কোপা দ্য ব্রাজিল। সাথে বুঝিয়ে দেন তাঁর আগমন স্রেফ ইতিহাস গড়তে!

এরপর ব্রাজিলের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপের ক্লাব পর্যায়ে থিতু হতে সময় লাগেনি তাঁর আর। তখনকার সেলেচাও কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিওর পরামর্শে তিনি ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনে যোগ দেন। সেখানে প্রথম মৌসুমেই করেন ৩০ গোল। পিএসভির হয়ে ৫৮ ম্যাচে ৫৪ গোল করার পর রেকর্ড ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডে ১৯৯৬ সালে বার্সেলোনায় যোগ দেন রোনালদো। সে বছরই ‘ফিফা প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’-এর সম্মাননা পান তিনি মাত্র ২০ বছর বয়সে!

বার্সায় এসেও রোনালদো তাঁর সেনসেশনাল স্ট্রাইকিং দক্ষতা ধরে রাখেন যথারীতি। টর্নেডো গতির ড্রিবলিং, বিধ্বংসী সব শট আর জাদুকরী সব ফ্লিকের প্রদর্শনীতে প্রথম মৌসুমেই কাতালানদের হয়ে ৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল করে ফুটবল দুনিয়ায় তাক লাগিয়ে দেন রোনালদো। ক্যাম্পোস্তেলার ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে করা তাঁর সেই বিখ্যাত গোলের পর স্বয়ং বার্সা বস লুই ফন গাল বলেছিলেন, ‘আমি ঈশ্বরকে (খেলতে) দেখেছি’। আর স্প্যানিশ পত্রিকাগুলো শিরোনাম ছাপে, ‘পেলে ফিরে এসেছেন’!

তবে চুক্তি নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় রোনালদোর বার্সেলোনা অধ্যায় দীর্ঘায়িত হয়নি। মোটে এক মৌসুম খেলেই বার্সা ছেড়ে দ্বিতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফির রেকর্ড ভেঙে ইন্টার মিলানে যোগ দেন তিনি। অথচ, সিরি ‘আ’-তে তখন বিশ্বের স্বনামধন্য ডিফেন্ডারদের একচ্ছত্র আধিপত্য। যে কোনো প্রসিদ্ধ স্ট্রাইকারের জন্যই সেখানে গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হলেও রোনালদো সবকিছুকে ভুল প্রমাণ করেন। প্রথম মৌসুমেই ২৫ গোল করে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন তিনি। জেতেন ‘সিরি আ ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও।

পরের মৌসুমেও ইতালিয়ান লিগে সমুজ্জ্বল থাকেন এই সেলেচাও কিংবদন্তি। মৌসুমটিতে একেবারে পরিণত ফরোয়ার্ডের চরিত্রে আবির্ভাব ঘটে তাঁর। প্রতিপক্ষের রক্ষণের গ্যাপ খুঁজে তাদের নাস্তানাবুদ করা, স্পট কিক ও ফ্রিকিক থেকে কার্যকরভাবে গোল আদায় করে নেওয়া এবং দলের প্রয়োজনে ইতালিয়ান তারকা স্ট্রাইকার রবার্তো ব্যাজ্জিও ও ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরিকে অ্যাসিস্ট করা—সবকিছুতেই অনবদ্য হয়ে ওঠেন তিনি। ফলাফল? রোনালদো জিতে নেন ব্যালন ডি’অর।

ক্লাবের পাশাপাশি ব্রাজিলের জার্সিতেও তাঁর গোল ক্ষুধা ছিল তীব্র। ব্রাজিলের হয়ে ৯৮ ম্যাচে ৬২ গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন সেটিই। ক্রুজেইরোতে থাকতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পান তিনি। তবে তখন ব্রাজিলীয় তারকা স্ট্রাইকার রোমারিওয়ের দাপটের কারণে গোটা আসরটাই সেবার বেঞ্চে বসে কাটাতে হয় তাঁকে। এরপরও সাম্বাদের বিশ্বজয়ের সঙ্গী হন তিনি।

পরের আসরে রোনালদোর অভিষেক হলেও রানার্স-আপ হয়ে সান্ত্বনা পেতে হয় ব্রাজিলকে। ফাইনালের আগে ঘটে তাঁর জীবনের সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও!

ফাইনালের দিন দুপুরের খাবারে সতীর্থ রবার্তো কার্লোসের সাথে রুমে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান রোনালদো। পরে হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফাইনালে নামলেও পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি ছিলেন নিষ্প্রভ। ব্রাজিলও তেমন সুবিধা করতে পারেনি আর। ফরাসিদের কাছে শিরোপা খোয়ায় তাঁরা।

কিন্তু ২০০০-২০০১ মৌসুমে দীর্ঘ ইনজুরির ধকল কাটিয়ে ২০০২ সালের জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে বীরের মতো প্রত্যাবর্তন ঘটে রোনালদোর। ফাইনালে টুর্নামেন্টজুড়ে কোনো গোল হজম না করা জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কানকে দু-দুবার পরাস্ত করেন এই তারকা। সাত ম্যাচে আট গোল করে সেবার গোল্ডেন বুটটাও নিজের করে নেন ‘দ্য ফেনোমেনন’। দুনিয়াবাসী প্রত্যক্ষ করে এশিয়ার মাটিতে সেলেচাও উৎসবের।

ক্ষুরধার গতি, নিখুঁত ফিনিশিং আর সেই মুক্তোঝরা হাসির জাদুতে স্ট্রাইকিংকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া কিংবদন্তি তারকার নাম রোনালদো নাজারিও। দুনিয়া হয়ত অনেক স্ট্রাইকারের কারিকুরি দেখেছে এবং দেখবে, কিন্তু রোনালদোর মতো স্ট্রাইকিংয়ে এভাবে বিপ্লব ঘটাতে পারবেন কজন আর, তা ফুটবল বিধাতাই ভালো জানেন!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link