ফুটবলের মুকুটহীন বরপুত্র

প্রথাগত ফুটবলের ব্যাকরণ ভেঙে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অনন্য ট্যাকটিক্যাল স্কিলসের জোরে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বেকহ্যাম। তাই ফুটবলের মুকুটহীন বরপুত্র যদি কেউ হয়ে থাকেন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ডেভিড বেকহ্যামই!

ধরুন, আপনি ছয় বছরের এক শিশু। ক্লাসে শিক্ষক আপনার কাছে জানতে চাইলেন, ‘তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?’ আপনি হয়ত বলতেন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা আইনজীবী হবো। এ ধরনের উত্তর দেয়নি এক শিশু, অবিশ্বাস্যভাবে শিক্ষকের এমনই এক প্রশ্নের বিপরীতে সে অকপটে বলেছিল সে শুধুমাত্র ফুটবলার হতে চায়! সেই জেদি শিশুটাই যে বিশ্ব ফুটবলের এক মুকুটহীন বরপুত্র হয়ে উঠবেন, সেদিন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি! হ্যাঁ, তিনিই ডেভিড বেকহ্যাম।

১৯৭৫ সালে লন্ডনের লেইনস্টন অঞ্চলে জন্ম নেওয়া ছোট্ট ডেভের ধ্যানজ্ঞান ছিল কেবলই ফুটবল। পড়াশোনার চেয়ে মাঠের বলই তাকে বেশি টানত। শৈশবেই বাঁকানো শটের জাদুতে প্রতিবেশীদের মাঝে মুগ্ধতা ছড়াতে শুরু করেন তিনি। আশির দশকের শেষ দিকে লেটন ওরিয়েন্ট ও নরউইচ সিটিতে ট্রায়াল দেন ডেভিড বেকহ্যাম। কিন্তু তাঁর পারফরম্যান্স ক্লাব স্কাউটদের মনঃপূত হয়নি তখন।

তবে, হাল ছাড়েননি কিশোর বেকহ্যাম। হন্যে হয়ে তিনি ক্লাব থেকে ক্লাবে ঘোরেন খেলার আশায়। শেষে খুলে যায় তাঁর ভাগ্যের দুয়ার। তিনি যোগ দেন টটেনহ্যাম হটস্পারের বয়সভিত্তিক দলে।

১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৫ লিগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ‘প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন তিনি। এরপরই স্বপ্ন ধরা দেয় তাঁর কাছে এসে। যুক্তরাজ্যের তখনকার সেরা ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দলে ভেড়ায় বেকহ্যামকে।

এরপরের গল্পটা কেবলই ইতিহাস। দীর্ঘ সময় শুরুর একাদশে থিতু হওয়া প্রথমে চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায় ডেভের জন্য। কিন্তু এতে তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং, অনুশীলন সেশনে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সেট পিস অ্যাকিউরেসির দক্ষতা তৈরি করেন নিজের ভেতরে। পাশাপাশি, মাঝমাঠে ইমপ্যাক্ট তৈরি করে খেলার কৌশল রপ্ত করে ছয় মৌসুম বাদেই দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন তরুণ বেকহ্যাম।

২০০০ সালে শিরোপাহীন মৌসুম কাটানোর পর তরুণদের ওপর কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। আর ঘুরে যায় বেকহ্যামের জীবনের মোড়। সাবেক রেড ডেভিল তারকা ক্যান্টোনার ঐতিহাসিক ৭ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়ে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

চুল আর ফ্যাশনের বিষয়ে আজন্ম সচেতন বেকহ্যাম কেবল নিজের শারীরিক সৌন্দর্যের প্রতিই যত্ন নিতেন না। মাঠে তিনি দলের জন্যও নিজের সবটা উজাড় করে দিতে ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। ডান প্রান্ত দিয়ে তাঁর পিনপয়েন্ট ক্রসিং আর ছোট-বড় নিখুঁত পাসের পসরা ম্যানইউকে এনে দিত মোমেন্টাম। বিশেষত, গ্যারি নেভিলের সাথে তাঁর ওভারল্যাপের রসায়ন প্রায়শই প্রিমিয়ার লিগ ডিফেন্ডারদের ঘুম কেড়ে নিত।

সেন্ট্রাল মিডফিল্ডিং পজিশন থেকে পুরো খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে দূরপাল্লার পাসের কারিকুরি দেখাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন বেকহ্যাম। ১৯৯৯ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের কথা মনে করলে বিষয়টা সহজেই প্রতীয়মান হয় দর্শকদের কাছে। বায়ার্নের বিপক্ষে তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ১-০ গোলে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ম্যাচের অ্যাডিশনাল টাইমে বেকহ্যামের নেওয়া দুটি কর্নার থেকেই গোল করে ইউনাইটেড জিতে নেয় তাঁদের ঐতিহাসিক ট্রেবল!

কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে ডেভিড বেকহ্যাম আদতে অমর হয়ে থাকবেন তাঁর অনবদ্য বাঁক খাওয়া ফ্রি-কিকগুলো হতে গোল করার জন্য। বলে কিক নেওয়ার আগে তিনি ইংরেজি বর্ণ ‘S’ আকৃতির এক অদ্ভুত রান-আপ নিতেন সবসময়। সাথে বাম হাত দিয়ে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতেন দৃঢ়ভাবে। আর শেষ পদক্ষেপটা যথাসম্ভব বড় রেখে বলের ভেতর অসম্ভব গতিশক্তির সঞ্চার করে দিতেন তিনি। ব্যস! তাতেই নিখুঁত কার্ভে বল উড়ে গিয়ে জড়াত জালে।

এ কারণেই, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ফ্রি কিক থেকে রেকর্ড ১৮টি গোল করার কীর্তি রয়েছে এই ইংলিশ মিডফিল্ডারের দখলে। খোদ ব্রাজিলের কিংবদন্তি রবার্তো কার্লোসও বেকহ্যামের ফ্রি-কিকের মুগ্ধ ভক্ত বনে গিয়েছিলেন। তাঁর সব নান্দনিক ফ্রি কিকের দৃশ্য আজও দোলা দেয় দুনিয়ার কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীদের অন্তরকে!

৩৮৮ ম্যাচে ৮৫ গোল আর ১০৯টি অ্যাসিস্ট করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধ্যায় চুকানোর পর ২০০৩ সালে তিনি পাড়ি জমান রিয়াল মাদ্রিদে। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে লস গ্যালাকটিকোদের ডেরায় জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও আর লুইস ফিগোদের সঙ্গী হন বেকহ্যাম। সেখানে জেতেন স্প্যানিশ সুপার কাপ ও লা লিগা। তবে সেখানে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানটা তেমন উজ্জ্বল হয়নি তাঁর। ১৫৯ ম্যাচে ২০ গোল আর ৫১টি অ্যাসিস্ট করেন রিয়ালে।

তাই ২০০৭ সালে ইউরোপ ছেড়ে থিতু হন আমেরিকার এলএ গ্যালাক্সিতে। সেখানে ফুটবলকে নতুন রূপ দেন তিনি। বেকহ্যামের ম্যাচ থাকলেই স্টেডিয়ামে ভেঙে পড়তে দেখা যায় দর্শকদের উন্মাতাল স্রোত! অথচ, মার্কিন মুলুকে তখনও সেভাবে ফুটবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।

এখানেই শেষ নয়! তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে আমেরিকার মেজর লিগ সকারে বেকহ্যাম রুলের প্রবর্তন করা হয়। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের লিগে বিদেশি খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সুবিধা ও মূল্যায়ন করার বিশেষ নিয়ম। গ্যালাক্সিতে পাঁচ বছরে বেকহ্যাম জয় করেন দুটি সাপোর্টারস শিল্ড ও দুটি এমএলএস কাপ।

এর বাইরে, জাতীয় দল ইংল্যান্ডের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপে খেলেন ডেভিড বেকহ্যাম। ১১৫টি ম্যাচ খেলে ২৯টি গোলে অবদান রাখেন তিনি। আর অধিনায়ক হিসেবে থ্রি লায়ন্সদের ৫৮টি ম্যাচে নেতৃত্ব দেন এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার। পৃথক পৃথক তিনটি বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম ইংলিশ ফুটবলারও তিনি।

কিন্তু আফসোসের বিষয়, ক্যারিয়ারে কখনো বিশ্বকাপ জেতেননি বেকহ্যাম। ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফা বর্ষসেরার ট্রফি জয়ের মুকুটও কখনো মাথায় ওঠেনি তাঁর। তবু প্রথাগত ফুটবলের ব্যাকরণ ভেঙে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অনন্য ট্যাকটিক্যাল স্কিলসের রপ্ত করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বেকহ্যাম। তাই ফুটবলের মুকুটহীন বরপুত্র যদি কেউ হয়ে থাকেন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ডেভিড বেকহ্যামই!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link